নীরবে একটি বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে দেশের লেনদেন ব্যবস্থায়। নাম বাংলা কিউআর। গত ৯০ দিনে এই কিউআর কোডে লেনদেন বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। দৈনিক ২৮ কোটি টাকা থেকে এখন লেনদেন হচ্ছে ১৪৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন এই গতি আরও বাড়াতে চায়। আগামী ১ নভেম্বর থেকে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (পিটুপি) টাকা পাঠানো যাবে বাংলা কিউআরে। একই সঙ্গে লেনদেনের সব চার্জ শূন্য করে উল্টো প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, যারা এই ব্যবস্থায় আসবে না, তাদের অস্তিত্বই থাকবে না।
৯০ দিনে কী ঘটল :
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, গত জুনে দৈনিক গড়ে বাংলা কিউআরে লেনদেন হতো ১ লাখ, যার আর্থিক মূল্য ২৮ কোটি টাকা। ৩০ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দৈনিক ৩ লাখ ৫০ হাজার লেনদেনে, টাকার অঙ্কে ১৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৯০ দিনে লেনদেনের সংখ্যা বেড়েছে সাড়ে তিনগুণ টাকার অংকে পাঁচগুণ। এর পেছনে বড় কারণ ১ জুলাই থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ দেয়, দেশে যত নিজস্ব কিউআর আছে- বিকাশ, নগদ, রকেট, ব্যাংকের আলাদা কিউআর সব বন্ধ করে একটাই কিউআর ব্যবহার করতে হবে, সেটি বাংলা কিউআর। বর্তমানে দেশে ৩৯ লাখ মার্চেন্টের কাছে বাংলা কিউআর আছে।
১ নভেম্বর থেকে নতুন সুবিধা :
ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি- এতদিন বাংলা কিউআর দিয়ে শুধু দোকানে পেমেন্ট (পি টু এম) করা যেত। এখন থেকে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেনও করা যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে সব ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে তাদের অ্যাপে এই সুবিধা যুক্ত করতে হবে।
এটি কীভাবে কাজ করবে :
ধরুন আপনি রিকশাচালককে ২০ টাকা দেবেন। তার একটি ব্যক্তিগত বাংলা কিউআর থাকবে। আপনি আপনার বিকাশ বা যেকোনো ব্যাংক অ্যাপ দিয়ে স্ক্যান করে টাকা পাঠাবেন। অথবা তার কিউআরের ছবি আপনার ফোনে থাকলে সেটি আপলোড করেও টাকা পাঠাতে পারবেন। নম্বর টাইপ করে ভুল নম্বরে টাকা চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, রিকশাচালক, বাসের কন্ডাক্টর, হকার, সবজি বিক্রেতা-যারা- প্রতিদিন ছোট ছোট লেনদেন করেন, তাদের জন্যই এই সুবিধা। ।। এতে খুচরা টাকার সংকট কমবে।
চার্জ শূন্য, উল্টো প্রণোদনা :
বাংলা কিউআর জনপ্রিয় না হওয়ার বড় কারণ ছিল চার্জ। প্রথমে ১ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যবসায়ীরা আপত্তি তোলেন। বাজারে লেনদেনে প্রভাব পড়ছে দেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। গত ১০ আগস্ট সার্কুলার দিয়ে সব চার্জ শূন্য করা হয়। ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি (আইআরএফ) বলে যে আন্তঃব্যাংক চার্জ ছিল, তা তুলে দেওয়া হয়। অর্থাৎ গ্রাহক ১০০০ টাকা পেমেন্ট করলে দোকানদার পুরো ১০০০ টাকাই পাবে, মাঝখানে কোনো কাটা যাবে না। শুধু তাই নয়, ১ অক্টোবর থেকে প্রণোদনা চালু হয়েছে। ২০০০ টাকা পর্যন্ত প্রতি লেনদেনে মার্চেন্টের ব্যাংক পাবে হাজারে ১ টাকা, গ্রাহকের ব্যাংক পাবে হাজারে ২ টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো যাতে বেশি বেশি বাংলা কিউআর ব্যবহার করায়, সে জন্য তাদের উল্টো টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আরেকটি বড় পরিবর্তন :
আরেকটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে, টাকা তাৎক্ষণিক জমা। আগে বাংলা কিউআরে পেমেন্ট করলে দোকানদার টাকা পেত ১ দিন পর। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ ছিল। ১ অক্টোবর থেকে তাৎক্ষণিক জমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এখন থেকে পেমেন্টের ১০ সেকেন্ডের মধ্যে দোকানদারের হিসাবে টাকা জমা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া হুঁশিয়ারি :
বাংলা কিউআরের আওতায় যারা থাকবে না- তাদের সমস্যায় পড়তে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে কড়া ভাষায় বলেন, 'অনেকে মনে করছেন বাংলা কিউআরের সম্প্রসারণে তাদের ব্যবসা কমে যাবে, আসলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। যারা বাংলা কিউআরের সঙ্গে থাকবে না, তাদের অস্তিত্বও থাকবে না।'
ব্যাংকগুলোকে তাদের মোবাইল অ্যাপের হোমপেজের ঠিক মাঝখানে বাংলা কিউআর আইকন রাখতে বলা হয়েছে। যাতে গ্রাহক সহজে খুঁজে পায়। একই সঙ্গে জালিয়াতি বন্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অনেকে দোকানে গিয়ে পণ্য না কিনে কিউআরে পেমেন্ট করে ক্যাশ টাকা তুলে নিচ্ছিলেন। এটিকে 'মার্চেন্ট ক্যাশ আউট' বলে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এমন করলে অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হবে।
বাংলা কিউআরের আসল লক্ষ্য :
বাংলা কিউআরের আসল লক্ষ্য হচ্ছে- প্রতিটি লেনদেনের তথ্য রাখা। বাংলা কিউআরের পেছনে শুধু ডিজিটাল পেমেন্ট নয়, আরও বড় লক্ষ্য আছে। ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র বলেন, 'বাংলা কিউআর বাংলাদেশ ব্যাংকের নয়, সরকারের উদ্যোগ। এর মূল উদ্দেশ্য প্রতিটি লেনদেনের তথ্য রাখা। এর সঙ্গে সরাসরি রাজস্বের সম্পর্ক আছে। দেশে মোট লেনদেনের ৮০ শতাংশ এখনও নগদে হয়। ফলে ব্যবসায়ীরা বিক্রি লুকিয়ে ভ্যাট ফাঁকি দেয়। বাংলা কিউআরে লেনদেন হলে সব তথ্য ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচে (এনপিএসবি) জমা হবে। এনবিআর চাইলে সেই তথ্য ব্যবহার করে প্রকৃত বিক্রি যাচাই করতে পারবে। বর্তমানে দেশে টিআইএনধারী ১ কোটি ১০ লাখ, রিটার্ন দেন ৩৫ লাখ। ফেসবুকে ব্যবসা করেন ৫ লাখ উদ্যোক্তা। তাদের বেশিরভাগ করের বাইরে। বাংলা কিউআর তাদের করের আওতায় আনতে সাহায্য করবে।
সামনে চ্যালেঞ্জও আছে :
বাংলা কিউআর নিয়ে সামনে চ্যালেঞ্জও আছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সারা দেশের গ্রাম পর্যায়ের ক্ষুদ্র দোকানদার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাংলা কিউআরের আওতায় আনা। কেন না গ্রামে এখনও ৪০ শতাংশ দোকানে ভালো ইন্টারনেট নেই। অনেক মানুষ এখনও কিউআর স্ক্যান করতে ভয় পান। আর ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সব লেনদেন ব্যাংকে ঢুকলে আয়কর অফিস থেকে নোটিস আসবে। তবু কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদী। ভারতে ইউপিআই দিয়ে মাসে ১৮০০ কোটি লেনদেন হয়। বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে মাসে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়, কিন্তু তার ৯০ শতাংশই ক্যাশ আউট। কিউআরে পেমেন্ট মাত্র ২ শতাংশ। এই ২ শতাংশকে ২০ শতাংশে নিতে পারলে ক্যাশলেস বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি