মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে নদীতে মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলছে। তবে মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা নদীর বিভিন্ন এলাকায় এ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইলিশ শিকার ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। নদীর তীরেই বসছে মাছের অস্থায়ী হাট। সেখানে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে ডিমওয়ালা মা ইলিশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম চরাঞ্চল ও নজরদারির সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির জেলে ও ব্যবসায়ী এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার বন্দরখোলা, মাদবরেরচর, চরজানাজাত ও কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়ন সংলগ্ন পদ্মার তীরে এমন চিত্র দেখা যায়। নদী থেকে ট্রলারে করে মাছ এনে ঘাটে নামানোর পরপরই তা কিনে নিচ্ছেন ফড়িয়ারা। পরে নদীর পাড়ে বসানো অস্থায়ী হাটে বিক্রি করা হচ্ছে এসব মাছ। নিষেধাজ্ঞা চললেও টাটকা ইলিশ কেনার আশায় বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা সেখানে ভিড় করছেন।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ ও কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
সরেজমিনে বন্দরখোলা ইউনিয়নের কাজিরসূরা ও চরজানাজাতের হিরা খাঁ এলাকায় দেখা যায়, দুপুরের পর থেকে একের পর এক মাছ ধরার ট্রলার ঘাটে ভিড়ছে। ট্রলার থেকে মাছ নামানোর পরপরই তা কিনে নিচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। পরে ঝুড়িতে সাজিয়ে ক্রেতাদের কাছে দরদাম করে বিক্রি করা হচ্ছে। সেখানে এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা এবং ছোট আকারের ইলিশ ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়।
চরজানাজাত ইউনিয়নের হিরা খাঁ বাজারের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাজারসংলগ্ন পদ্মার তীরে অস্থায়ী হাট বসছে। সেখানে নিয়মিত মা ইলিশ কেনাবেচা হচ্ছে। তবে এসব বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান তার চোখে পড়েনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জেলে বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়কে সামনে রেখে তাদের অনেকে ৬০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়ে জাল কিনেছেন। এখন মাছ ধরা বন্ধ রাখলে সেই ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। সংসারের খরচ ও ঋণের চাপ সামলাতে তারা মাছ ধরতে বাধ্য হচ্ছেন বলে দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, এবার নদীতে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। ক্রেতাদের কেউ কেউ একসঙ্গে ৫ থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
ইলিশ কিনতে শেখপুর থেকে এসেছেন শাহ আলম মুন্সী। তিনি বলেন, ‘এখানে এসে নিজের চোখে মাছ দেখে কিনতে পারছি। মাছগুলো টাটকা, আবার পছন্দমতো বেছে নেওয়ারও সুযোগ আছে। তাই দূর থেকে হলেও এখানে মাছ কিনতে এসেছি। প্রতিদিনই জেলেদের মাছ নিয়ে আসতে এবং মানুষকে কিনতে দেখা যায়।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) শিবচর শাখার সভাপতি মো. আবুল খায়ের খান বলেন, একটি মা ইলিশ একবারে কয়েক লাখ ডিম দিতে পারে। তাই প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ নিধন বন্ধ করা জরুরি। নদীতে অভিযান জোরদারের পাশাপাশি অবৈধ মাছের হাট বন্ধ এবং অসচ্ছল জেলেদের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ইলিশের উৎপাদন ও নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সচেতন হতে হবে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান এড়াতে মাছ শিকারের সঙ্গে জড়িত একটি চক্র চরাঞ্চলে সতর্ককারী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতির খবর পেলেই তা দ্রুত জেলেদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর তাঁরা ট্রলার নিয়ে কাশবন বা নদীর অন্য অংশে সরে যান। এতে অভিযান শুরুর আগেই অনেক সময় নদী ও ঘাট ফাঁকা হয়ে যায় বলে দাবি তাঁদের।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, জনবলসংকটের কারণে পুরো এলাকায় শতভাগ নজরদারি নিশ্চিত করা কঠিন। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার শুরু থেকে এ পর্যন্ত অভিযানে কাউকে গ্রেপ্তার বা জাল ধ্বংস করা না গেলেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ. এম. ইবনে মিজান বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান চলছে। পদ্মার তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ অস্থায়ী হাটগুলো বন্ধ করতে শিগগিরই বড় ধরনের সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও পদ্মায় ইলিশ শিকার ও বিক্রির এমন চিত্রে মা ইলিশের প্রজনন সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর অভিযান জোরদারের মাধ্যমে অবৈধ মাছ শিকার ও বিক্রি বন্ধে প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
সময়ের আলো/জোই