সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের নিয়ে অশালীন ও যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে ‘নো মোর সাইলেন্স’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ। বিভিন্ন সংবাদ ও আলোচিত ঘটনার পোস্টে নারীদের হেনস্তা করা ব্যক্তিদের ছবি, পরিচয় ও ফেসবুক আইডির লিংক প্রকাশ করছে গ্রুপটি। তাদের দাবি, এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মন্তব্যের স্ক্রিনশট পাঠানোর পর সতর্কও করা হয়েছে তাদের।
গত বছরের ২ নভেম্বর যাত্রা শুরু করা গ্রুপটির বর্তমান সদস্যসংখ্যা ৩৬ হাজার। এর প্রতিষ্ঠাতা লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট আবির আহম্মেদ পিয়াস। তার ভাষ্য, অনলাইনে অবমাননাকর ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার বিষয়গুলো সামনে আনাই গ্রুপটির উদ্দেশ্য। তার মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতিও দায়িত্বশীল থাকা প্রয়োজন।
যেভাবে শুরু
হবিগঞ্জের একটি কনসার্টে নারীদের যৌন হয়রানির ঘটনা থেকে গ্রুপটি গড়ে তোলার চিন্তা করেন তিনি। বৃন্দাবন সরকারি কলেজের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে জালাল স্টেডিয়ামে আয়োজিত ওই কনসার্টে নারীদের হেনস্তার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ব্যক্তি এ ধরনের ঘটনার কদর্য বর্ণনা দিয়ে মন্তব্য করেন। মন্তব্যটিতে অনেকে ‘হা হা’ প্রতিক্রিয়া জানান।
বিষয়টি দেখে ক্ষুব্ধ হন আবির আহম্মেদ পিয়াস ও তার দুই সহযোগী। তাদের মনে হয়, নারীদের হেনস্তা করার পাশাপাশি অনলাইনে তা নিয়ে গর্ব করা কিংবা হাসাহাসিরও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। এরপর তারা ‘নো মোর সাইলেন্স’ গড়ে তোলেন।
গ্রুপটির দুই মডারেটরের একজন উম্মে সুরাইয়া সুমি। তিনি নতুন উদ্যোক্তা এবং পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি। অন্য মডারেটর জাকিয়া হোসেন উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
হবিগঞ্জের ঘটনায় ওই ফেসবুক আইডির পরিচয় প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট আইডি থেকে দাবি করা হয়, মুঠোফোন হারানোর পর আইডিটি হ্যাক করে অন্য কেউ মন্তব্য করেছিলেন। এ জন্য ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কনসার্টের আয়োজকদের কাছে অবহিতপত্র ও অঙ্গীকারনামা দেওয়ার কথাও জানানো হয়।
আলোচিত ঘটনায় মন্তব্যকারীদের পরিচয় প্রকাশ
বিভিন্ন আলোচিত ঘটনায় নারীদের লক্ষ্য করে করা অশালীন মন্তব্যের স্ক্রিনশট প্রকাশ করছে গ্রুপটি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের একটি হোটেলের শৌচাগারে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হলে, সেটির নিচে অশালীন মন্তব্য করা ৬ ব্যক্তির ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করা হয়।
একইভাবে, গত ১৫ জানুয়ারি সাভারে বাসের মধ্যে এক যাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত খবরের নিচে ধর্ষণের পক্ষে মন্তব্য করা পাঁচ ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করে গ্রুপটি।
পরিচয় প্রকাশের পর সতর্কতা ও ক্ষমা
গ্রুপটির দাবি, পরিচয় প্রকাশের পর কয়েকটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সতর্ক করা হয়েছে। এক ব্যক্তি মেয়ের কলেজজীবনের শুরুর ছবি ফেসবুকে পোস্ট করলে, সেখানে অশালীন মন্তব্য আসে। গ্রুপে মন্তব্যটি প্রকাশের পর তা ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে ওই ব্যক্তি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে দেন। গ্রুপটির ভাষ্য অনুযায়ী, তার কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও স্ক্রিনশট পাঠানো হয়।
এছাড়া, ফরিদপুরের এক তরুণ নিজের বোনের সঙ্গে অরুচিকর আচরণ করে ভিডিও তৈরি করতেন বলে অভিযোগ তুলে গ্রুপে পোস্ট দেওয়া হয়। গ্রুপটির দাবি, পরে পুলিশ তাকে আটক করে এবং ওই তরুণ ফেসবুকে ক্ষমা চেয়ে ভবিষ্যতে এমন ভিডিও তৈরি না করার অঙ্গীকার করেন।
এ ছাড়া কুমিল্লায় হত্যার শিকার এক কিশোরকে নিয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর টুম্পা মাকসুদার পোস্টের নিচে তাকে ও তার মাকে লক্ষ্য করে যৌন সহিংসতামূলক মন্তব্য করেন যশোর মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী। গ্রুপটি মন্তব্যের স্ক্রিনশট কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠালে- এমন ঘটনা আবার ঘটলে তাকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।
ভুল পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকিও রয়েছে
নারীদের হেনস্তার বিরুদ্ধে সামাজিক জবাবদিহি তৈরির উদ্যোগের পাশাপাশি পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে ভুলের ঝুঁকিও রয়েছে। কুমিল্লার এক কিশোরীর মায়ের বক্তব্য নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের নিচে অশালীন মন্তব্য করা এক ব্যক্তি নিজেকে রাজধানীর সানরাইজ প্লাজার বিশ্বরঙ শোরুমের বিক্রয়কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। গ্রুপে তার পরিচয় প্রকাশের পর বিশ্বরঙ এক বিবৃতিতে জানায়, ওই নামে তাদের কোনো কর্মী নেই। এ ঘটনা পরিচয় প্রকাশের আগে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব সামনে এনেছে। কোনো ব্যক্তির নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে অন্য কেউ মন্তব্য করছেন কি না, তা নিশ্চিত না হয়ে পরিচয় প্রকাশ করলে নির্দোষ কেউ হয়রানির শিকার হতে পারেন।
আইনে শাস্তির বিধান
নারীর শালীনতা বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি কিংবা কোনো কিছু প্রদর্শনের মাধ্যমে অপমান করাকে দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ধারায় এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২৫ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে ব্ল্যাকমেলিং, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত উপাদান কিংবা সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর বা ভীতিপ্রদ উপাদান প্রকাশের বিষয়ে শাস্তির বিধান রয়েছে। নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে এসব অপরাধ সংঘটিত হলে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
সময়ের আলো/মহু