সকালে ঘুম থেকে উঠেই মুঠোফোন হাতে নিয়ে ফেসবুক খোলা। অন্যের পোস্ট করা ছবি দেখা, কারও ভ্রমণের গল্প, কারও নতুন চাকরি, কারও সাফল্যের খবর। এরপর নিজের জীবনের সঙ্গে সেসবের অদৃশ্য তুলনা শুরু হয়। দিন শেষে হয়তো মনে হয় সবাই ভালো আছে, শুধু আমিই পিছিয়ে। অথচ ‘সবাই ভালো আছে’— এ ধারণাই অনেক সময় বাস্তব জীবনের বড় বিভ্রম। ফেসবুক আমাদের জীবনের একটি অংশ, পুরোটা নয়। সেখানে আমরা সাধারণত জীবনের নির্বাচিত মুহূর্তগুলোই তুলে ধরি। থাকে আনন্দের ছবি, সাফল্যের গল্প, নতুন পোশাক ও ভ্রমণের দৃশ্য। কিন্তু ব্যর্থতা, হতাশা, পারিবারিক অশান্তি, আর্থিক সংকট কিংবা নিঃসঙ্গতার রাতগুলো খুব কমই প্রকাশ পায়। ফলে ফেসবুকে দেখা অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের পুরো জীবনকে তুলনা করাটাই হয়ে ওঠে অসম।
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার কতটা ব্যাপক, তার ধারণা পাওয়া যায় ‘ডিজিটাল ২০২৬ : বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে। ডেটারিপোর্টালের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ দেশে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর পরিচয় ছিল। একই সময়ে মেটার বিজ্ঞাপন তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফেসবুকের সম্ভাব্য বিজ্ঞাপনপ্রাপ্তির পরিধিও ছিল প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ। তবে এই সংখ্যা সরাসরি সক্রিয় বা স্বতন্ত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যা নির্দেশ করে না। অর্থাৎ ফেসবুক এখন আমাদের সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ভার্চুয়াল উপস্থিতি বাস্তব সম্পর্ক ও অনুভূতিকে ছাপিয়ে যেতে শুরু করে। ফেসবুকে কাউকে যতটা সুখী দেখায়, বাস্তবে তিনি ততটা সুখী কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। একটি ছবি তুলতে হয়তো কয়েক ঘণ্টা প্রস্তুতি নিতে হয়, বারবার ছবি তুলে সেরা মুহূর্তটি বেছে নিতে হয়। আমরা দেখি ফলাফল, প্রক্রিয়া নয়; হাসি, দুঃখ নয়; সাফল্য, ব্যর্থতার দীর্ঘ পথ নয়।
এভাবেই শুরু হয় সামাজিক তুলনা। অন্যের নতুন চাকরি দেখে নিজের চাকরি নিয়ে হতাশ হওয়া, বন্ধুর বিদেশ ভ্রমণের ছবি দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করা কিংবা কারও বিয়ের ছবি দেখে নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অস্বস্তিতে পড়া এখন অস্বাভাবিক নয়। অথচ ফেসবুকে আমরা অন্যের সেরা মুহূর্তগুলো দেখি আর নিজের জীবনের সব মুহূর্তের সঙ্গে সেগুলোর তুলনা করি। এ ধরনের তুলনা আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে এবং নিজের অর্জনগুলোকেও তুচ্ছ মনে করাতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন বিশ্লেষণে শিশু-কিশোরদের অতিরিক্ত ডিজিটাল ব্যবহারের সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা ও একাকিত্বের মতো ঝুঁকির সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। দীর্ঘ সময় ডিজিটাল মাধ্যমে কাটালে বাস্তব সম্পর্কের জন্য সময় কমে যেতে পারে। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও ঘুমের ঘাটতির ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ফেসবুক নিজেই খারাপ। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা কীভাবে এটি ব্যবহার করছি। ফেসবুক দূরের মানুষকে কাছে আনতে পারে, পুরোনো বন্ধুত্ব ফিরিয়ে দিতে পারে, শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে পারে, ব্যবসার প্রচার করতে পারে এবং চাকরি ও কাজের সন্ধান দিতে পারে। সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগও এর মাধ্যমে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তাই প্রযুক্তিকে দোষারোপ করে সমস্যার সমাধান হবে না, প্রয়োজন সচেতন ব্যবহার।
বাস্তব জীবনের ক্ষতি শুরু হয় তখন, যখন অনলাইনে থাকা ধীরে ধীরে জীবনযাপনের বিকল্প হয়ে ওঠে। একই ঘরে বসে থেকেও পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে নিজ নিজ মুঠোফোনে ব্যস্ত থাকেন। রাতের খাবারের সময়ও চলে অনলাইন ঘাঁটাঘাঁটি। বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেও কথোপকথনের চেয়ে ছবি তোলা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমনকি কোনো সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করার আগেই কেউ কেউ ভাবতে শুরু করেন, সেটি কীভাবে ফেসবুকে তুলে ধরা যায়। এভাবে মুহূর্তকে উপভোগ করার বদলে মুহূর্ত দেখানোর প্রবণতা বাড়তে থাকে।
ফেসবুকের আরেকটি সমস্যা হলো ‘লাইক’ ও মন্তব্যের মাধ্যমে নিজের মূল্যায়ন করার প্রবণতা। কোনো পোস্টে বেশি প্রতিক্রিয়া এলে ভালো লাগে, কম এলে মন খারাপ হয়। অথচ একটি পোস্টে কতজন প্রতিক্রিয়া জানালেন, তা দিয়ে মানুষের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। একজনের সাফল্য, সম্পর্ক, চরিত্র কিংবা মানসিক শান্তির নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি লাইক বা মন্তব্যের সংখ্যা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াকে নিজের আত্মমর্যাদার ভিত্তি করে তুললে অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়তে পারে।
বাস্তব জীবন কখনোই ফেসবুকের মতো সাজানো থাকে না। সেখানে ভুল আছে, অপেক্ষা আছে, ব্যর্থতা আছে, অপ্রত্যাশিত সমস্যাও আছে। সব ছবি সুন্দর হয় না, সব দিন ভালো কাটে না, সবাই সব সময় হাসেন না। কিন্তু এই অসম্পূর্ণতার মধ্যেই বাস্তব জীবনের সৌন্দর্য। বাস্তব জীবনেই মানুষ পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ায়, ব্যর্থতা থেকে শেখে, কষ্টের মধ্যেও হাসে এবং ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করে। জীবনের প্রকৃত সাফল্য শুধু অন্যের চোখে ভালো থাকা নয়, বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া এবং সম্পর্কগুলোকে যত্নে ধরে রাখা।
শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি