কারণ ছাড়া কখনোই বিক্ষোভ শুরু হয় না এবং রাস্তা খালি করে দিলেই সেই কারণ উধাও হয়ে যায় না। নয়াদিল্লির সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলো এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রাজধানী শহরের প্রধান সংযোগ সড়কগুলো থেকে আন্দোলনকারীদের সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া হলেও যে অসন্তোষ ও প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা এতটুকু লাঘব হয়নি। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ক্ষমতা ও পুলিশি চাপ দিয়ে সাময়িকভাবে রাজপথ খালি করা সম্ভব হলেও জনগণের মনে জমে থাকা মৌলিক প্রশ্নের নিরসন কখনোই রাজপথের ব্যারিকেড দিয়ে সম্ভব নয়।
নির্বাচনি সততা নিয়ে দিল্লিতে ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদ, বিরোধী নেতাদের আটক এবং পুলিশের ব্যাপক পদক্ষেপ ও বিধিনিষেধ ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে পর্যালোচনার আওতায় এনেছে। সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতাদের নির্বিচারে আটকের ঘটনা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। সরকারের এই অনমনীয় অবস্থান বিতর্ককে প্রশমিত করার পরিবর্তে নাগরিক সমাজকে সরকারের বিরুদ্ধে আরও বেশি সোচ্চার করে তুলছে।
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটি সাংবিধানিক স্বাধীনতা, নির্বাচনি বিশ্বাসযোগ্যতা এবং শাসকদের চ্যালেঞ্জ করার নাগরিকদের অধিকারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারবে কি? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা অবশ্যই প্রশাসনের দায়িত্ব, তবে সেই অজুহাতে জনগণের প্রশ্ন তোলার সাংবিধানিক অধিকারকে সংকুচিত করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নাগরিকের স্বাধীনতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করাই হলো গণতন্ত্র টিকে থাকার প্রধানতম শর্ত।
ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদের অধীনে বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। এই ধারাটি দেশের প্রতিটি নাগরিককে স্বাধীনভাবে নিজের মতপ্রকাশ, সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ এবং অসন্তোষ প্রকাশ করার পূর্ণ আইনি অধিকার প্রদান করে। মতপ্রকাশের এই অধিকার কেবল ক্ষমতাসীনদের প্রশংসার জন্য নয়, বরং সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটিগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তিসংগত আওয়াজ তোলার আইনি চাবিকাঠি হিসেবে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূল ভিত্তি স্থাপন করে।
একইভাবে সংবিধানের ১৯(১)(খ) অনুচ্ছেদের অধীনে সাংবিধানিকভাবে অনুমোদিত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্রভাবে সমাবেশ করার অধিকার সুরক্ষিত আছে। নাগরিকরা সংঘবদ্ধ হয়ে নিজেদের দাবি তুলে ধরবেন এবং রাজপথে বা নির্দিষ্ট স্থানে একত্রিত হবেন— এটি কোনো উপহার নয়, বরং সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার। কিন্তু পুলিশি বিধিনিষেধের কারণে যখন সমাবেশের অধিকারকে স্থগিত বা সংকুচিত করা হয়, তখন তা সরাসরি দেশের মূল সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
এই অধিকারগুলো নিরঙ্কুশ নয়, আবার রাজনৈতিক সুবিধার জন্য প্রদত্ত বা প্রত্যাহার করা বিশেষ সুবিধা হিসেবেও গণ্য করা যায় না। অর্থাৎ জনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্র বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারলেও কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে বা বিরোধীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে আইনি ক্ষমতার প্রয়োগ অনুচিত। বাকস্বাধীনতা ও সমাবেশের অধিকারকে যদি শাসক দল নিজের সুবিধার ওপর ভিত্তি করে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তবে তা সাংবিধানিক সুশাসনের মৌলিক নীতিকে মারাত্মকভাবে ধ্বংস করে দেয়।
সংবিধানের প্রতীকী তাৎপর্য নিজে থেকে এটি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না যে কোনো নির্দিষ্ট পুলিশি অভিযান ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘন করেছে কি না। আইন ও শৃঙ্খলার যুক্তি দেখিয়ে যখন পুলিশ হাজার হাজার মানুষকে আটক করে বা কঠোর প্রোটোকল বাস্তবায়ন করে, তখন আদালতের নজরদারিতে সেই সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সেই সিদ্ধান্তের যথার্থতা নির্ধারণের জন্য প্রমাণ, প্রযোজ্য আইন এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন যাতে বোঝা যায় যে রাষ্ট্রের গ্রহণ করা পদক্ষেপটি আসলেই অনিবার্য ছিল, নাকি অপব্যবহার।
একটি প্রধান অর্থনীতি, আঞ্চলিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে এক প্রভাবশালী অংশগ্রহণকারী হিসেবে ভারত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী ধারণা তৈরি করে। দক্ষিণ এশিয়ায় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান কেবল একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি কার্যকর স্থিতিশীল গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে। তাই অভ্যন্তরীণ রাজপথে জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ এবং গণতান্ত্রিক নীতিমালার প্রয়োগ কেবল দেশের সীমানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর পর্যবেক্ষণেও ব্যাপকভাবে ধরা পড়ে।
এই বিতর্কটি একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জকে প্রতিফলিত করে, যখন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন তারা কীভাবে তাদের বৈধতা ধরে রাখতে পারে? নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের ওপর যদি কোনো দেশের জনগণের আস্থা উঠে যায়, তবে পুরো শাসনব্যবস্থার বৈধতা সংকটের মুখে পড়ে। প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নিরপেক্ষতার স্থান থেকে সরে এসে কোনো নির্দিষ্ট নীতির পক্ষে অবস্থান নেয়, তখন গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি ভারতের নতুন অপরাধ আইন বা ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা এবং রাজধানীর মেট্রো স্টেশনগুলো বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়গুলো আইনি পর্যালোচনার শীর্ষে এসেছে। জরুরি অবস্থায় এই ধরনের প্রতিরোধমূলক আইনি ধারা জারি করার সুযোগ থাকলেও নিয়মিতভাবে বিক্ষোভ বন্ধে এমন পদক্ষেপ ব্যবহার করাকে আইনজীবীরা সাংবিধানিক অনুপাতের নীতির লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করছেন। অতিরিক্ত নজরদারি কেবল নাগরিকের মনে ক্ষোভের পরিধি বৃদ্ধি করে।
বিক্ষোভ চলাকালে হাজার হাজার নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী এবং বিরোধীদলীয় নেতাদের ঢালাওভাবে গ্রেফতার ও আটক করার নীতি উদ্ভূত সংকটকে কেবল জটিল করেছে। রাজনৈতিক সংলাপ ও গণতান্ত্রিক সমঝোতার পথ বন্ধ করে যদি শক্তির জোরে রাজপথ নীরব করার চেষ্টা করা হয়, তবে রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হয়। শাসক দল ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে এই মুখোমুখি অবস্থান ভারতের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য কোনো শুভ বার্তা বহন করছে না।
ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচনি সংস্কার ইস্যুতে তরুণ সমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণ এই আন্দোলনের শক্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ যুবক, শিক্ষার্থী এবং তরুণ প্রযুক্তিবিদদের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা প্রমাণ করে যে নতুন প্রজন্ম প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার প্রশ্নে কোনো আপস করতে রাজি নয়। কেবল পুরোনো দিনের গতানুগতিক রাজনৈতিক বিবৃতি দিয়ে যুবসমাজের এই ডিজিটাল ও মাঠপর্যায়ের অসন্তোষ দমন করা এখন প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত কঠিন।
বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভারতের এই সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক বিতর্কগুলোকে অত্যন্ত গভীর নজরে পর্যবেক্ষণ করছেন। কারণ দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ ও নীতির ওপর নির্ভরশীল। ভারতের মতো বড় গণতন্ত্রে যদি প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়ে, তবে পুরো অঞ্চলের অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর তার নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়তে বাধ্য।
রাজধানীতে দীর্ঘমেয়াদি বিধিনিষেধ, পরিবহন বন্ধ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা ভারতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে মন্থর করছে। বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের আগে কেবল অর্থনৈতিক বাজার দেখেন না, বরং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসনের নিশ্চয়তা খোঁজেন। দিল্লিতে এই ধরনের ঘন ঘন পুলিশি লকডাউন ও ইন্টারনেট কড়াকড়ি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী মহলে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে নেতিবাচক বার্তা পাঠায়, যা দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যের ক্ষতি করে।
দিল্লির এই জটিল আইনি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জনস্বার্থ, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো রক্ষা এবং পুলিশি ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার প্রতিরোধে আদালতকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। বিচার বিভাগ যদি নিরপেক্ষতা এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষায় দৃশ্যমান ও শক্ত অবস্থান গ্রহণ না করে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে সংবিধানের সুরক্ষা কেবল কাগজের অক্ষরেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এবং স্বাধীন গণমাধ্যমগুলোর ওপর চাপ বাড়ার কারণে সাংবাদিকতার স্বাধীনতাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। একটি সুস্থ ও সবল গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ ওয়াচডগ বা প্রহরীর ভূমিকা পালন করে। গণমাধ্যমের এই কণ্ঠ যদি রাষ্ট্রীয় নীতি কিংবা ক্ষমতার দাপটে রুদ্ধ করা হয়, তবে ভুল সিদ্ধান্তের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প আর অবশিষ্ট থাকে না, যা শাসনব্যবস্থাকে একনায়কতন্ত্রের দিকে ঠেলে দেয়।
রাজপথ খালি করার পুলিশি অভিযানের চেয়েও এখন বেশি প্রয়োজন সব রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এক স্বচ্ছ ও গঠনমূলক সংলাপে বসা। বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনি অনিয়মের অভিযোগ ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজপথের ক্ষোভ দমন না করে ক্ষোভের আসল কারণগুলো খুঁজে বের করে তার সমাধান করা ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার আর কোনো সহজ পথ নেই।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা