দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া, পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি এভাবেই শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণীরা। তারা নিজেদের স্বপ্নপূরণের পাশাপাশি অবদান রাখছে পরিবারেও। উপজেলার হারুয়ালছড়ি, খিরাম, কাঞ্চননগর ও সুয়াবিলসহ উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা ও চা-বাগানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস।
এসব এলাকার অনেক তরুণী প্রতিদিন দুর্গম পথ পেরিয়ে বিদ্যালয় ও কলেজে যাতায়াত করেন। কেউ পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করছেন, আবার কেউ উচ্চশিক্ষা শেষে কর্মজীবনেও প্রবেশ করছেন।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, ২০২২ সাল পর্যন্ত উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা ১২ হাজার ৮৭৭ জন। এর মধ্যে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ৮ হাজার ৯৯১, চাকমা ১ হাজার ৩১৩ এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ২ হাজার ৫৭৩ জন। উপজেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ এসব জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
তবে, স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্তমানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা আগের তুলনায় ক্রমেই বেড়েছে। গত দুই দশকে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হওয়ায় এসব জনগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপকভাবে পড়াশোনার আগ্রহ বেড়েছে।
সরেজমিনে এসব এলাকা ঘুরে কথা বলে জানা যায়, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণীরা বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, বিদ্যালয় ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। এতে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি পরিবারেও আর্থিক অবদান রাখছেন তারা।
ফটিকছড়ির একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন প্রমি চাকমা (২০)। পাশাপাশি তিনি নাজিরহাট ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে পড়েন। প্রমি বলেন, ‘সকাল সাতটায় বাড়ি থেকে বের হই, ফিরতে রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটা বেজে যায়।’ কর্মক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয়না। শুরুর দিকে ভাষা বুঝতে কিছুটা সমস্যা হতো। এখন তেমন সমস্যা হয় না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্র্যাকে কর্মরত এক তরুণী জানান, ‘স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি চাকরিতে যোগ দেন। পরিবারের একজন সরকারি চাকরি করেন এবং এক বোন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। আগে তাদের পরিবার পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করলেও বর্তমানে ফটিকছড়ি সদরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছেন।’ কর্মক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয় না তবে অনেকেই আমাদের নিজেদের মানুষের মতো করে মিশতে চান না।’
ফটিকছড়ি উপজেলা প্রেসক্লাবের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শহীদুল আলম বলেন, ‘শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেড়েছে গত দুই দশকে প্রত্যন্ত এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন।’
ফটিকছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ইউইও) মো. আব্দুর রব বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা এখন মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছে।’
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সময়ের আলো/জোই