নওগাঁ সদর উপজেলায় দিনদুপুরে বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রের মুখে মোছা. হাবিবা ইয়াসমিন চমক (৩০) নামে নারীকে অচেতন করে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার ২৪ দিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাননি স্বজনরা। মেয়েকে ফিরে পেতে সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করে কোনো হদিস না পেয়ে অবশেষে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন ভুক্তভোগীর বাবা।
নিখোঁজ নারীকে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে নির্যাতন, পাচার কিংবা হত্যার পর মরদেহ গুম করা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।
এ ঘটনায় নওগাঁর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর বাবা দুলাল হোসেন (৫৯) বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলা নম্বর: ১৫০/২০২৬ (নাঃ শিঃ)।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৯(১)/৩০ ধারায় দায়ের করা এই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সদর উপজেলার কীর্তিপুর (মুরাপাড়া) গ্রামের পিন্টু হোসেনের ছেলে রিয়াদ হোসেনকে (২৮)। মামলার অন্য আসামিরা হলেন—রিয়াদের ভাই মাহবুব হোসেন (২৪), বাবা পিন্টু হোসেন (৫৫), মা রোকেয়া বেগম এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার-পাঁচজন।
আদালতে দাখিল করা মামলার আরজি সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী চমককে দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন অভিযুক্ত রিয়াদ হোসেন। কিন্তু চমক তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে চমকের বিয়ে হলেও তাকে উত্ত্যক্ত করা বন্ধ করেননি রিয়াদ। মামলার বাদীর অভিযোগ, রিয়াদের অব্যাহত উত্ত্যক্ত ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে একপর্যায়ে চমকের প্রথম সংসার ভেঙে যায়। এরপরও তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছিল।
মামলার বিবরণে বলা হয়, গত ২০ সেপ্টেম্বর (রোববার) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চমকের বাবা দুলাল হোসেন ও তার ভাই কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ির বাইরে যান। ওই সময় বাড়িতে চমক ও তার মা অবস্থান করছিলেন।
এ সুযোগে অভিযুক্ত রিয়াদ হোসেন তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের নিয়ে একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসে করে তাদের বাড়িতে আসেন। এরপর রামদা, চাকু, ছোরা ও লোহার রডসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জোরপূর্বক ঘরে প্রবেশ করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা অস্ত্রের মুখে মা-মেয়েকে হত্যার হুমকি দেন এবং চমককে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় মা-মেয়ে চিৎকার শুরু করলে তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে রিয়াদ চেতনানাশক ওষুধ মেশানো রুমাল দিয়ে চমকের মুখ চেপে ধরেন। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে অভিযুক্তরা তাকে দ্রুত মাইক্রোবাসে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে কেটে পড়েন।
ঘটনার পরপরই মেয়েকে উদ্ধারের আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে অভিযুক্তদের বাড়িতে যান দুলাল হোসেন। কিন্তু সেখানে মেয়ের সন্ধান পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো মারধর, হত্যা ও মরদেহ গুম করার হুমকির মুখে পড়েন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর ২১ সেপ্টেম্বর সকালে নওগাঁ সদর মডেল থানায় মামলা করতে যান দুলাল হোসেন। তবে পুলিশ থানা থেকে মামলা গ্রহণ না করে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেয় বলে বাদীর অভিযোগ। পরে ২২ সেপ্টেম্বর নওগাঁর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে মেয়ের কোনো সন্ধান না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বাবা দুলাল হোসেন ও তার স্বজনরা।
উদ্বেগ প্রকাশ করে দুলাল হোসেন বলেন, ‘ঘটনার এত দিন পার হলেও আমার মেয়ের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। আসামিরা ওকে আটকে রেখে নির্যাতন করছে নাকি মেরে মরদেহ গুম করেছে, তা নিয়ে চরম আতঙ্কে আছি। আমরা দ্রুত মেয়েকে উদ্ধার ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
নওগাঁ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান জানান, ভুক্তভোগী পরিবার থানায় আসার পর তাদের আইনি পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। যেহেতু আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে, তাই আদালতের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ বা আদেশ হাতে পেলেই দ্রুত তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ভুক্তভোগীকে উদ্ধার ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।
এদিকে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত রিয়াদ হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যরা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার ২৪ দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো সুরাহা না হওয়ায় ভুক্তভোগীকে দ্রুত উদ্ধার এবং অপরাধীদের গ্রেফতারের দাবিতে সোচ্চার রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও।
সময়ের আলো/এনএন