চাকরির প্রলোভনে পাঠানো হয় রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে, প্রথমদিনেই ১৭ বাংলাদেশির মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে পাঠানো ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে স্পেশাল

2026-10-14T20:13:01+00:00
2026-10-14T20:13:01+00:00
 
  বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬,
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
এসআরবির ব্রিফিং
চাকরির প্রলোভনে পাঠানো হয় রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে, প্রথমদিনেই ১৭ বাংলাদেশির মৃত্যু
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:১৩ পিএম 
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন। সংগৃহীত ছবি
চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে পাঠানো ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। সংস্থাটির দাবি, যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রথম দিনেই মারা যান ১৭ জন। নিহতদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তান।  

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান। 

তিনি জানান, চলতি বছরের ৭ মে মানবপাচার চক্রের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশিকে ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় রাশিয়ায় পাঠানো হয়। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাদের মধ্যে ২১ জনকে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমানের সংশ্লিষ্টতা ছিল। 

এ ঘটনায় মানবপাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেফতার করেছে এসআরবি।  

সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, মানবপাচার চক্রের অন্যতম প্রধান হোতা মিজানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশে তিনটি প্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে।  

তিনি বলেন, বিদেশে সন্তান ও স্বজনদের পাঠানোর ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক করতেই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সবার জন্য শিক্ষণীয়।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর বাংলাদেশিদের একটি স্থানীয় হোটেলে আটকে রাখা হয়। এ সময় তাদের পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জব্দ করা হয়। এরপর প্রতিশ্রুত চাকরিতে নিয়োগ না দিয়ে তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীরা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে দেশে ফেরার আকুতি জানালেও তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। পরে তাদের একটি ক্যাম্পে নিয়ে ২১ দিনের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ, তাদের পরিবারের বক্তব্য এবং বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান মোহা. আসাদুজ্জামান।  

তিনি জানান, ওই ৩০ জনের মধ্যে দুজন গুরুতর আহত অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে তাদের দেশে ফেরানো হয়। তাদের একজন রাজন, অন্যজন আদনান। রাজনের দুই পায়ে গুরুতর আঘাত রয়েছে বলে জানান তিনি।  

রাজনের বর্ণনা অনুযায়ী, ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশিদের তিনটি ভাগে ভাগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়। প্রথম ভাগে ফ্রন্টলাইনে ছিলেন ১৬ জন, মাঝের ভাগে ছয়জন এবং শেষ ভাগে ছিলেন আটজন। 

এসআরবির কর্মকর্তা বলেন, প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ফ্রন্টলাইনে থাকা ১৬ জনের মধ্যে ১২ জন মারা যান। মাঝের ভাগে থাকা ছয়জনের মধ্যে চারজন এবং শেষ ভাগে থাকা আটজনের মধ্যেও চারজনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে প্রথম দিনের যুদ্ধেই মারা যান ১৭ জন।

রাজনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মোহা. আসাদুজ্জামান জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে তার পিঠের ওপর একটি ড্রোন পড়ে। এতে তার কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে আসতে থাকে। 

এ অবস্থায় পাশে থাকা একটি ওয়াকিটকির মাধ্যমে একজন মিশরীয় অনুবাদকের সাহায্যে তাকে উদ্ধারের অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু তাকে উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসআরবির কর্মকর্তা বলেন, আহত অবস্থায় রাজন শরীরের ওপরের অংশের ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ বুক ঘষে ক্যাম্পের কাছাকাছি পৌঁছান। পরে চিকিৎসার জন্য সাহায্য চাইলে প্রথমে তার কাছে অস্ত্র আছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। 

রাজন জানান, নিজের জীবন বাঁচানোই তখন কঠিন হয়ে পড়েছিল। তার আশপাশে অনেকেই মারা গেছেন। এমন পরিস্থিতিতে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে আসার সময় অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে আসা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

এসআরবি জানিয়েছে, তাদের কাছে ওই ৩০ জনের তালিকা ও মোবাইল নম্বর রয়েছে। তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মৃত্যুর প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাদের অনেকেই এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কিংবা অন্যের কাছ থেকে ধার করে বিদেশে গিয়েছিলেন। কোনো কোনো পরিবারের ছোট সন্তান রয়েছে, কিন্তু তাদের খাবারের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, কিছু মা এখনো আশা করছেন, তাদের সন্তান ফিরে আসবেন। তবে বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

সংস্থাটির কর্মকর্তা আরও জানান, অনেক পরিবার এখনো তাদের স্বজনদের মরদেহ দেখতে পারেননি। নিহতদের দেশে ফেরার সুযোগ না হওয়ায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এসআরবি। সংস্থাটির প্রাথমিক ধারণা, পর্যাপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাদের ঝুঁকিপূর্ণ ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়েছিল প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য।

মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক প্রস্তুতি ও কৌশলগত প্রশিক্ষণ তাদের ছিল না। মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে কেন তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হলো, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। 

এসআরবির ধারণা, বাংলাদেশিদের একধরনের ‘শিকার’ হিসেবে ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। প্রতিপক্ষ তাদের ওপর ড্রোন হামলা চালালে সেই হামলার উৎস শনাক্ত করে রাশিয়ার সেনাবাহিনী প্রতিপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি। 

আরও পড়ুন

তবে এটি এসআরবির প্রাথমিক ধারণা; এ বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্তের তথ্য জানানো হয়নি।

এসআরবির কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিরা রাশিয়ায় যাওয়ার আগে এবং সেখানে পৌঁছানোর পরও সংশ্লিষ্ট চক্রের সদস্যদের কাছে দেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে ভুল পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। 

মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরি থেকে শুরু করে বিমানে তুলে দেওয়া পর্যন্ত মানবপাচার চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন। ভুক্তভোগীদের জীবন বিপন্ন হওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের স্বজনদের মরদেহ দেখতে না পাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তিনি জানান, প্রায় সব পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পরিবারগুলোর প্রধান দাবি, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।

সংবাদ সম্মেলনে এসআরবির কর্মকর্তা জানান, মানবপাচার চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তদন্তকারী সংস্থাকে তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে সহায়তা করছে এসআরবি।

মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত ও অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তদন্তকারী সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও বিস্তারিত প্রমাণ দেওয়া হচ্ছে। 

এ ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে এসআরবি বদ্ধপরিকর বলেও জানান তিনি।


সময়ের আলো/ইউএমএইচ


  বিষয়:   এসআরবি  রাশিয়া  যুদ্ধক্ষেত্র  বাংলাদেশি 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: