আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন (ইউপি)। ইসির ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী ২১ জানুয়ারি থেকে পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত হবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। দীর্ঘ ১০ বছর পর দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এ নির্বাচন।
তাই ইউপি নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দলের একাধিক প্রার্থী অংশ নিতে পারবেন। যদিও দল থেকে একজন প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দলগুলো। এরপরও নির্বাচনে জিততে হলে দল সমর্থিত প্রার্থীকে বিরোধী দলের প্রার্থীর পাশাপাশি নিজ দলের একাধিক প্রার্থীর মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। ফলে ইউপি নির্বাচনে পেশিশক্তির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন শুরুর আগেই সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ ও ভোটে সহিংসতা ও ভোট নিয়ে ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন ভোটারা। তবে ইউপি নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এমনকি নির্বাচনে কেউ সহিংসতার চেষ্টা করলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছে ইসি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজন করতে পারলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং দেশের নির্বাচনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
২০১৫ সালের ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান অনুমোদন করা হয়। এরপর ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথম দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হয়। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। নির্বাচন কমিশন ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ও প্রাণহানি ঘটেছিল। এ সময় ২৩৬ জন নিহত এবং আট হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিল। এরপর ২০২১-২২ সালের নির্বাচনে মোট ৬টি ধাপে ভোট হয়, যার মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ২০২১ সালেই ইউপি সহিংসতায় ১১৩ জন নিহত হন। পরবর্তী ধাপের সংঘাতসহ এ সংখ্যা ১১৬ জন ছাড়িয়ে যায়। ২০১৬ ও ২০২১ সালের নির্বাচনে সহিংসতার অন্যতম কারণ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় প্রতীক ব্যবহার ও দলীয় প্রার্থীর প্রতি ইসির আনুগত্যতা। এ ছাড়া একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ও মূল প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারের জেরে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে। এমনকি ব্যালট ছিনতাই, কেন্দ্র দখল ও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিদ্রোহী ও প্রতিপক্ষের ওপর হামলা হয়েছিল। দীর্ঘদিন এ নিয়ম চলার পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরে আইন সংশোধন করা হয়। এ কারণে একটি দলের একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। ফলে নির্বাচনে পেশিশক্তির আশঙ্কা করছে অনেকে। তাই আসন্ন ইউপি নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। ভোট কি আদৌ সুষ্ঠু হবে নাকি অতীত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সময়ের আলোকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমাদের কাছে প্রথম হলেও আমরা কিন্তু জাতীয় নির্বাচন করেছি। সেটি সুষ্ঠু হয়েছে বলে আমরা দাবি করি এবং সর্বমহলেও এটি প্রশংসিত হয়েছে। আমরা সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাব এবং ভালো নির্বাচন করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করব। স্থানীয় নির্বাচনে আমাদের নিরপেক্ষতার কোনো ঘাটতি থাকবে না। তবে ঐতিহাসিকভাবে এটি সত্য যে, স্থানীয় নির্বাচনে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ঝামেলা হয়। তারপরও আমরা আশাবাদী নির্বাচন আগের চেয়ে ভালো হবে।
ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি নির্ভর করে অনেক বিষয়ের ওপর। প্রথমত নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিভঙ্গি। ইসির একটা নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এবং তৃতীয় হলো পুলিং ও প্রিজাইডিংসহ নির্বাচনি কাজে নিয়োজিত থাকা কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি বলেন, আমাদের এখন ভালো রাজনীতির সংস্কৃতি চালু হয়েছে। সরকার কিংবা বিরোধী দল কেউ চাইবে না নির্বাচনে ঝামেলা হোক। তারপরও দলগুলো তাদের কর্মীদের কতটা সুশৃঙ্খল রাখতে পারবে এটি একটি প্রশ্ন। তবু আমরা সতর্ক আছি। প্রথমে আমরা জেলা হেডকোয়ার্টারগুলো করব যদি দেখি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক নেই, তা হলে আমরা সেনাবাহিনী নামাব। ভালো নির্বাচন করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করব। তিনি আরও বলেন, আমরা খুঁতহীন নির্বাচন করতে চাই। ভোটাররা যাতে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে সে বিষয়ে আমরা সতর্ক আছি। এ জন্য যা যা করার দরকার আমরা তা করছি। নির্বাচনে কেউ সহিংসতা করতে চাইলে তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সব উপজেলাতেই আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট থাকবে। আমরা নির্দেশনা দেব কেউ যদি আচারণবিধি ভঙ্গ করে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দিতে এবং যারা আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকবে তারাও যদি তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে অচেতন থাকে তা হলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। এই সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশন বদ্ধপরিকর।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ফজলে করিম সময়ের আলোকে বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হলে নির্বাচন সুষ্ঠু ও রিপেক্ষ হতে হবে। নির্বাচন যত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে ততই সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম সময়ের আলোকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ হওয়া উচিত। সবাই বলে সংসদ নির্বাচন ভালো হয়েছে— এই ভালোটা ধরে রাখতে হলে আমাদের একটা লংটার্ম লক্ষ্য থাকতে হবে। সেটি হচ্ছে নির্বাচনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। কারণ একটা ভালো নির্বাচন দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয় না। তাই ভবিষ্যতের সব নির্বাচন ভালো করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এটি করতে পারলে দেশের গণতন্ত্র এগিয়ে যাবে আর গণতন্ত্র এগিয়ে গেলে দেশের মানুষ, রাজনৈতিক দল সবাই উপকৃত হবে এবং স্বৈরশাসকের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। এ জন্য একটা জায়গায় সবাইকে ঐকমত্যে আসতেই হবে যে আর যাই হোক নির্বাচন নিয়ে আমরা বিতর্ক করব না এবং নির্বাচন কমিশনকে কোনো বিতর্কের মধ্যে জড়াব না। এ ধরনের একটা কমিটমেন্ট সবার মধ্যে থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে একটা বড় প্রশ্ন উঠবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটা আলোচনা ছিল যে, জাতীয় সংসদের মতো স্থানীয় নির্বাচনও কেয়ারটেকার বা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হওয়া উচিত। অনেক পলিটিক্যাল পার্টি স্থানীয় নির্বাচন আগে করারও দাবি করেছিল। যদি নির্বাচনটা ভালো হয় এই দাবিটা থাকবে না। তাই সরকারকেই প্রমাণ করতে হবে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেও ভালো নির্বাচন সম্ভব এবং এটি যদি এই সরকার স্টাবলিস্ট করতে পারে তা হলে তার যে ক্রেডিবিলিটি ও গ্রহণযোগ্যতা তা অনেক বেড়ে যাবে। সরকারের এজেন্ডাগুলোও বাস্তবায়ন করা সহজ হবে এবং সরকার বেনিফিটেড হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনে সহিংসতা যে থাকবে না তা আমার মনে হয় না। তবে ১৫ সাল থেকে যে সহিংসতা আমরা দেখেছিলাম সেটি হবে বলে মনে হয় না। কারণ তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বর্তমানের চিত্র ভিন্ন। তবে সহিংসতার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ স্থানীয় নির্বাচনে ক্রেজ খুব হাই থাকে, দল ও প্রার্থী সবাই মরিয়া হয়ে ওঠে। আর একটা কারণ হলো কোনো গোষ্ঠী যারা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চায় তারা হয়তো নানাভাবে সহিংসতা ছড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই আশঙ্কা যে নেই সেটি বলা যাবে না। সতর্ক থাকতে হবে। সহিংসতা মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের কিছু ব্যাকআপ রাখতে হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৩ অক্টোবর ইসির ১৩তম কমিশন সভা শেষে পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। ইসির ঘোষিত সূচি অনুযায়ী ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপ, ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ, ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপ, ১৩ মে চতুর্থ ধাপ এবং ২৭ মে পঞ্চম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। আইন অনুযায়ী ২০২৭ সালের ২৭ মের মধ্যে এসব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। সাধারণত ভোটগ্রহণের প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ দিন আগে এসব ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে