সংস্কারের নামে গণপূর্ত অধিদফতরের ঢাকার একাধিক বিভাগে সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ এবং দুই নার্সিং কলেজ ও ছাত্রাবাস সংস্কারের জন্য সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার (এপিপি) মাধ্যমে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা। একই ভবনের একই ফ্লোরে একই কাজ করা হয়েছে কয়েকটি ভাগে।
বেশিরভাগ কাজই প্রতি বছরের মতো দরজা-জানালা মেরামত ও রং করার নামে খাতা-কলমে সম্পন্ন দেখিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে বিল তুলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ তেজগাঁও, সিদ্ধিরবাজার ও মিল ব্যারাক এলাকার বিভিন্ন সরকারি দফতর, হাসপাতাল, পুলিশ লাইন্স ও সরকারি কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টারে সংস্কারকাজ না করেই বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
গণপূর্ত বিভাগ-৩-এর সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে এপিপির মাধ্যমে বিভিন্ন কাজের নামে ব্যয় দেখানো হয় প্রায় ১১ কোটি টাকা। এর একটা বড় অংশই অর্থবছরের শেষ দিকে মে ও জুনে টেন্ডার দেখিয়ে কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্নের নামে বিল তোলা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরেও সংস্কারের নামে ব্যয় দেখানো হয়েছিল ১১ কোটি টাকা। দুই অর্থবছরে এপিপির বরাদ্দ ২২ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৫ কোটি টাকা কাজ না করে বা নামমাত্র কাজ দেখিয়ে লোপাট করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপিপি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৩ লাখ টাকার মধ্যে ৩৫টি ছোট প্যাকেজে মোট প্রায় ১ কোটি টাকার কাজ করা হয়েছে, যার মধ্যে অনেক কাজেরই কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে ঢাকার তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেস অফিস ও স্টাফ কোয়ার্টারের বিশেষ মেরামত কাজ, তেজগাঁওয়ে গণপূর্ত অফিস-সংলগ্ন কোয়ার্টারে ডেঙ্গু মশা নিরোধকল্পে আশপাশের আগাছা কাটা, অপসারণ ও পরিষ্কার করা এবং ড্রেন পরিষ্কার ও নবায়ন কাজ, ঢাকার মিল ব্যারাক পুলিশ লাইন্সের মহিলা ব্যারাক ভবনের সিভিল স্যানিটারি মেরামত ও ড্রেন পরিষ্কার করার কাজ, ঢাকার তেজগাঁওয়ে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের প্রেস ভবনের পূর্ব পাশের ছাদের মেরামত কাজ, তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবন ও সেটেলমেন্ট প্রেসের বিভিন্ন ড্রেন পরিষ্কার এবং সংস্কার, ম্যানহোল কভার স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক মেরামত কাজ, তেজগাঁওয়ের ফরম ও প্রকাশনা অফিসের ফ্লোরের মোজাইক পরিষ্কার করাসহ আনুষঙ্গিক মেরামত কাজ, তেজগাঁওয়ের বিজি প্রেস স্টাফ কোয়ার্টারের ভবন নং-আই-এর ছাদের মেরামত কাজ, তেজগাঁওয়ে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের প্রেস ভবনের পশ্চিম পাশের ছাদের মেরামত কাজ, তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেসের বিভিন্ন অংশে ম্যানহোল কভার সø্যাব স্থাপন ও ড্রেন পরিষ্কার করার কাজ, তেজগাঁওয়ে জাতীয় নাক, কান ও গলা হাসপাতালে অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় জাতীয় হেড, নেক অ্যান্ড থাইরয়েড কংগ্রেস ২০২৫-এর জন্য জরুরি মেরামত কাজ, তেজগাঁওয়ে গভর্নমেন্ট প্রিন্টিং প্রেস স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার ড্রেন মেরামত ও পরিষ্কার করাসহ মেরামতকাজ।
এ ছাড়া ঢাকার সিদ্দিকবাজারে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের ভবন নং-৩-এর সিভিল স্যানিটারি মেরামত ও ড্রেন পরিষ্কার করার কাজ, তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেসের অফসেট শাখার অভ্যন্তরে প্রসেস শাখা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ, তেজগাঁওয়ে জাতীয় নাক, কান ও গলা হাসপাতাল ভবনের অডিটোরিয়ামের ছাদের বিশেষ মেরামত কাজ, তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেস স্টাফ কোয়ার্টারের ভবন নং-এ এবং ডি-এর ক্ষতিগ্রস্ত ছাদের স্থানগুলোর মেরামত কাজ, তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেস অফিস ও স্টাফ কোয়ার্টারের বিশেষ মেরামত কাজ, ঢাকার মিল ব্যারাক পুলিশ লাইন্সের মহিলা ব্যারাক ভবনের সিভিল স্যানিটারি মেরামত ও ড্রেন পরিষ্কার করার কাজ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ওপরের শিরোনামে অনেক কাজ না করেই অনিয়ম করে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। টেন্ডার ম্যাপিং করে নির্বাহী প্রকৌশলী তার নিজস্ব চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গোপনে টেন্ডার জমা দিয়ে একজনের নামে কার্যাদেশ দিয়ে কোনো কাজ না করে বা নামসর্বস্ব কাজ দেখিয়ে বিল তুলে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ভাগবাটোয়া করে নিয়েছেন। নির্বাহী প্রকৌশলী এবং সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে এসব অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে কার্যাদেশ, মাপবই, বিল-ভাউচার, কাজ সমাপ্তির সনদ এবং সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
একইভাবে গণপূর্ত ঢাকা মেডিকেল বিভাগে চারটি প্রতিষ্ঠান সংস্কারে গত চার অর্থবছরে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে সংস্কারের নামে ব্যয় দেখানো ১২ কোটি টাকার মধ্যে কয়েক কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। কয়েক বছরের কাজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে ঠিক একই ধরনের কাজ বিগত বছরগুলোতেও করা হয়েছে। একই ভবনের একই ফ্লোরে একই কাজ করা হয়েছে কয়েকটি ভাগে। বেশিরভাগ কাজই প্রতি বছরের মতো দরজা-জানালা মেরামত ও রং করার নামে খাতা-কলমে কাজ দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে অনেক কাজই না করে বিল তুলে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন। এর মধ্যে অধিকাংশ কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে অর্থবছরের শেষে মে ও জুনে। মূলত টাকা খরচ করার জন্য জুনে কাজ না করেই তড়িঘড়ি করে বিল তোলা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী এপিপির কাজের বিল দিতে দুই দফায় ১০ শতাংশ কমিশন নেন। আর ভুয়া কাজের ক্ষেত্রে অর্ধেক টাকা নেওয়া হয়। গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে দিতে হয় ৫ শতাংশ কমিশন।
অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, শুধু মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ নয়, ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগ, মতিঝিল গণপূর্ত বিভাগ, আরবরিকালচার বিভাগ, মিরপুর গণপূর্ত বিভাগ, সাভার গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধেও সংস্কারের নামে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরী এবং মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তরিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুল ইসলাম অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, কাজ না করে বিল দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সব নিয়ম মেনেই সংস্কারকাজ করা হয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে