রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে লেগেছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক-বাহক এই উদ্যানটি দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর বন্ধ ছিল। ছিল না জনসাধারণের পদচারণ। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এখন উদ্যানে লেগেছে সৌন্দর্যের ছোঁয়া। যে কেউ ঢুকলেই চোখে পড়বে নানা আয়োজনের সৌন্দর্য। ভালো লাগার একাধিক অপূর্ব দৃষ্টিনন্দনের অবতারণা করা হয়েছে।
লাগানো হয়েছে নানা জাতের ফুল, ফল ও গাছগাছালি। প্রথম দর্শনেই মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাবে দেহ-মনে। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে অবকাঠামোতে। জুলাই স্মৃতিস্তম্ভসহ নির্মাণ করা হয়েছে পাঠাগার, খাবারের দোকান, গাড়ি রাখার স্থান, ব্যায়ামাগার, টেবিল টেনিস ও বিলিয়ার্ড খেলার ব্যবস্থা, এটিএম বুথ, ওষুধের দোকান, নগর জাদুঘর, শিশুদের খেলার জায়গা, লেকের পাড় ও ঘাট, মাঠ ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উদ্যোগে ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নকাজ এবং নবনির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’-এর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ১৯ অক্টোবর সকাল ১০টায়। এর মধ্য দিয়ে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে এই দৃষ্টিনন্দন উদ্যানটি।
এদিকে প্রায় ২৪ একরের ওসমানী উদ্যান একসময় পুরান ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার মানুষের হাঁটা, বিশ্রাম ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমা ও উন্নয়নকাজের জন্য দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর প্রবেশাধিকার বন্ধ থাকায় সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন নগরবাসী। এখন নান্দনিকতায় উন্নয়ন অবকাঠামোর ছোঁয়ায় ঘেরা উদ্যানটি উদ্বোধনের অপেক্ষায়। ১৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সাজ সাজ রব ওসমানী উদ্যানে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর উদ্যান প্রাঙ্গণে সুধী সমাবেশ হবে। সেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা, জুলাই যোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্যসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে গত ৮ অক্টোবর বিভিন্ন কমিটি ও উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমানকে আহ্বায়ক করে ১৯ সদস্যের সার্বিক ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানের তদারকি করবে। মঞ্চ, প্যান্ডেল, সাজসজ্জা, এলইডি, শব্দ ও আসন ব্যবস্থাপনা উপ-কমিটিতে রয়েছেন সংস্থাটির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা। তার নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী মঞ্চ তৈরি, সাজসজ্জা, শব্দযন্ত্র ও এলইডি স্থাপন, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরবরাহ এবং আসন বণ্টনের দায়িত্ব পালন করবে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করে অভ্যর্থনা উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। রয়েছে আপ্যায়ন উপ-কমিটি। প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করে অনুষ্ঠানস্থলের নিরাপত্তা পরিকল্পনা, সিসি ক্যামেরা ও মেটাল ডিটেক্টর স্থাপন, নিরাপত্তা কন্ট্রোল রুম পরিচালনা, ভ্রাম্যমাণ পাবলিক টয়লেট স্থাপন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গঠন করা হয়েছে নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও শৃঙ্খলা উপ-কমিটি। রয়েছে আমন্ত্রণপত্র প্রস্তুত ও বিতরণ উপ-কমিটি।
সম্প্রতি সরেজমিন দেখা গেছে, ওসমানী উদ্যানে ঢুকতেই দেখা মিলল শ্রমিকরা কাজে ব্যস্ত। ইলেক্ট্রনিক মিস্ত্রিরা লাইটিংয়ে ব্যস্ত। পরিষ্কার করা হচ্ছে অবাঞ্ছিত জঙ্গল, ঘাটলাগুলো ধুয়েমুছে পরিষ্কার করছেন শ্রমিকরা। কারও যেন দম ফেলানোর ফুরসত নেই। ওসমানী উদ্যানে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভসহ রয়েছে নানা অবকাঠামো। স্মৃতিস্তম্ভের রিলিফ ভাস্কর্যে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য প্রামাণ্য আলোকচিত্রের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও আত্মমর্যাদার দীর্ঘ আন্দোলন— বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম সেই ধারাবাহিক লড়াইয়ের এক নতুন ও অবিনাশী অধ্যায় হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। নতুনভাবে সাজানো এই উদ্যানে হাঁটার পথ, পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটানোর সুবিধা, রেস্তোরাঁ, আধুনিক লাইব্রেরি, শিশুদের খেলার সুনির্দিষ্ট স্থান, কৃত্রিম পানির ফোয়ারা ও মনোরম জলধারা রয়েছে।
এ ছাড়া সচিবালয় সংলগ্ন এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানটির সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করতে এবং পরিবেশ মনোরম রাখতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আধুনিক করা হয়েছে বাউন্ডারি ওয়াল। ১২টি ফুড কোর্ট, রয়েছে দুটি ঘাটলা। সবখানেই রয়েছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। ইতিমধ্যে লাগানো হয়েছে ঔষধি, ফলদ ও গাছগাছড়া। এর মধ্যে রয়েছে স্বর্ণচাপা, কদবেল, তেঁতুল, আম, গাব, সোনালু, জামরুল, শিমুল, নিম, কাঠবাদাম, কাঠগোলাপ, আমড়া, সুপারি, বহেরা, জলপাই, জাম, ক্যাসিয়া, কৃষ্ণচূড়া, বোটলব্রাশ, পলাশসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ।
এদিকে ওসমানী উদ্যানে আলাদা প্রকল্পে নির্মাণ করা হয়েছে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। স্মৃতিস্তম্ভে প্রবেশের মুখে রয়েছে দুটি বিশেষ প্রবেশদ্বার। নকশায় ইংরেজি ‘২৪’ ও ‘৫’ সংখ্যার সমন্বয়ে একটি শৈল্পিক অ্যাম্বিগ্রাম ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ‘২৪’ দিয়ে ২০২৪ সাল এবং ‘৫’ দিয়ে ৫ আগস্টকে বোঝানো হয়েছে। প্রবেশপথের দুই পাশে রয়েছে ১০টি করে মোট ২০টি ঘনকাকৃতির পাথুরে এপিটাফ। কেন্দ্রীয় স্তম্ভের দুই পাশে রয়েছে চারটি করে মোট আটটি আয়তাকার ‘পারসিভড কলাম’।
আপাতদৃষ্টিতে এগুলোকে আলাদা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এগুলো একটি অবিচ্ছিন্ন আবদ্ধ রেখা, যা কেন্দ্রীয় বৃত্তাকার কলামের ভেতর দিয়ে অতিক্রান্ত হয়ে ১৬টি বিন্দুতে কোণ তৈরি করে দিক পরিবর্তন করেছে। এই কলামগুলো রাজনৈতিক, সামাজিক ও মতাদর্শিক নানা বৈচিত্র্য সত্ত্বেও বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। অন্যদিকে ১৬টি কোণে গতি পরিবর্তনকারী অবিচ্ছিন্ন রেখাটি নির্দেশ করে এ দেশের মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র অর্জনের দীর্ঘ ও আপসহীন লড়াইয়ের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।
ভাস্কর্যটি দুটি অংশে বিভক্ত। ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও ৭ ফুট উঁচু ভেতরের অবতল দেয়ালে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ৩৬ দিনের রক্তাক্ত ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। এর আয়তন ১ হাজার ১৪১ বর্গফুট। বাইরের উত্তল দেয়ালটি ১৭২ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৪ ফুট উঁচু। ৭৭৪ বর্গফুটের এই অংশে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের চার ঐতিহাসিক অধ্যায়কে তুলে ধরা হয়েছে। এতে সরকারি গেজেটভুক্ত শহিদদের পাশাপাশি পরিচয় না পাওয়া ব্যক্তিদের স্মৃতিও তুলে ধরা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভটির কেন্দ্রীয় স্তম্ভের উচ্চতা ৯০ ফুট।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ ও আহত ব্যক্তিদের স্মৃতি এবং আন্দোলনের ইতিহাস ধরে রাখার উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা থেকে শুরু করে ছাত্র-শিক্ষক-জনতার প্রতিরোধ এবং ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ, আন্দোলনের ৩৬ দিনের বিভিন্ন মুহূর্ত তুলে ধরা হয়েছে এই ভাস্কর্যে। পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা হিসেবে স্থান পেয়েছে ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ ও ১৯৯০-এর চার ঐতিহাসিক অধ্যায়।
গত ১১ অক্টোবর সচিবালয়ে ‘ওসমানী উদ্যান আধুনিকায়ন এবং নবনির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন’ উপলক্ষে প্রস্তুতি সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়িত ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান এবং সেখানে নবনির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ১৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধন ও সুধী সমাবেশ শেষে একই দিনে উদ্যানটি সর্বসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। প্রায় দীর্ঘ ১০ বছর বন্ধ থাকার পর নগরবাসী এই দৃষ্টিনন্দন উদ্যানটি ব্যবহার করতে পারবেন।
ওসমানী উদ্যানের উন্নয়নকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। পরের মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজের উদ্বোধন করা হয়। শুরুতে ১০ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা হয়নি। দফায় দফায় সময় বাড়ানো হয়। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে একপর্যায়ে আগের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন ঠিকাদারও নিয়োগ দিতে হয়েছে। এরপরও বছরের পর বছর উদ্যানটি সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ থাকে। প্রায় ২৪ একরের ওসমানী উদ্যান একসময় পুরান ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার মানুষের হাঁটা, বিশ্রাম ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল; কিন্তু উন্নয়নকাজের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রবেশাধিকার বন্ধ থাকায় সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন নগরবাসী।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ওসমানী উদ্যানের অবকাঠামো উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে নগরবাসী পাবেন এক নতুন দিগন্ত। এখানে রয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। রয়েছে নানা নান্দনিকতা। ওসমানী উদ্যান ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ইতিহাস-ঐতিহ্য আরও বেশি জানতে পারবেন নগরবাসী।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে নির্মিত এই স্মৃতিস্তম্ভকে মেমোরি স্টাডিজের আধুনিক দর্শনে একটি সক্রিয় ও জীবন্ত স্মৃতি-পরিসর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। দর্শনার্থীরা এখানে শুধু স্মৃতিচিহ্ন দেখবেন না; তারা চত্বরে প্রবেশ করে শহিদদের নাম পড়বেন, জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিচারণ করবেন এবং ইতিহাসের গৌরবময় প্রবাহের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক অনুভব করবেন। এ ছাড়া রয়েছে নানা অবকাঠামো। এই উদ্যানে হাঁটার পথ, পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটানোর সুবিধা, রেস্তোরাঁ, আধুনিক লাইব্রেরি, শিশুদের খেলার সুনির্দিষ্ট স্থান, কৃত্রিম পানির ফোয়ারা ও মনোরম জলধারা রয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে