ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের আরও সময় দেওয়া হলে তারা ‘অপরাজেয় দানবে’ পরিণত হবে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জুবা। তিনি জানিয়েছেন, হুতিদের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধবিরতি বা আলোচনায় বসার কোনো পরিকল্পনা ইয়েমেন সরকারের নেই। বরং বিদ্রোহীদের সামরিক সক্ষমতা মোকাবেলা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দিচ্ছে সরকার।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ইয়েমেনের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জুবা। সৌদি সংবাদমাধ্যম আরব নিউজ এ খবর জানিয়েছে।
আল-জুবা বলেন, হুতিদের আরও সময় দেওয়া হলে তারা অপরাজেয় একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হবে। তারা দানবে পরিণত হবে।
তার মতে, হুতিদের এই হুমকি এখন আর শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংকটে সীমাবদ্ধ নেই; আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলসহ বৃহত্তর অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও তা বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ
ইয়েমেন সরকার অতীতে শান্তির প্রত্যাশায় যে নীতির ওপর নির্ভর করেছিল, তা থেকে সরে এসেছে বলে জানান আল-জুবা। তার অভিযোগ, সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে হুতিরা নিজেদের পুনর্গঠিত করেছে, অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধ করেছে এবং রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল করার জন্য আবারও হামলা চালিয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাচ্ছি না। হুতিদের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরুরও আহ্বান জানাচ্ছি না।
তবে ভবিষ্যতে কোনো যুদ্ধবিরতি বা রাজনৈতিক সমঝোতা হলে তা কার্যকর হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত নিশ্চিত করতে হবে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, একই চুক্তিতে আবারও স্বাক্ষর করে ভিন্ন ফল পাওয়ার আশা করতে চায় না ইয়েমেন সরকার।
রিয়াদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ১৩ জনের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবারের ওই হামলায় সৌদি আরব, বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, সুদান ও ভারতের নাগরিকেরা নিহত হন। আহত হন তিন শতাধিক মানুষ।
একই সপ্তাহে এডেন বিমানবন্দরেও হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিযোগ তোলেন তিনি।
আল-জুবা এসব ঘটনাকে ‘দুটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, হুতিদের এখন আর শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের একটি পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তার মতে, তারা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত করার অভিযোগ
ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইরান হুতিদের ব্যবহার করছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে কেন্দ্র করে চাপ তৈরির চেষ্টা চলছে বলে দাবি তার।
আল-জুবার ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর সৌদি আরব তাদের তেল রফতানির একটি অংশ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে সরিয়ে নেয়। এরপর বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে চাপ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তার দাবি, গত মাসে লোহিত সাগরের উপকূলে হুতিদের সামরিক তৎপরতা এই কৌশলেরই অংশ ছিল।
হুতিরা সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য কোনো জাহাজের চলাচলে বাধা দেবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিল উল্লেখ করে আল-জুবা বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাস করেনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইরান হুতিদের অস্ত্র, অর্থ, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। তার দাবি, এসব অভিযোগের পক্ষে নথিভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে।
প্রমাণ হিসেবে তিনি ২০১৩ সালে ইরানি অস্ত্র বহনের অভিযোগে ‘জিহান-১’ নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজ আটক এবং ২০২৫ সালে হুতিদের জন্য পাঠানো প্রায় ৭৫০ টন সরঞ্জাম ও অস্ত্র জব্দের ঘটনা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেল এসব ঘটনা তদন্ত করেছে।
আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল পর্যন্ত হুতিদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
আল-জুবার দাবি, হুতিরা আগে ইরানের সামরিক দক্ষতা ও সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন নিজেরাও অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পর্যবেক্ষণের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, হুতিদের সামরিক প্রকৌশলীরা সোমালিয়ায় গিয়ে আল-শাবাব যোদ্ধাদের বিস্ফোরক ব্যবহার, ড্রোনের পরিবর্তন এবং অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই বিস্তৃত যোগাযোগব্যবস্থাকে তিনি ‘লোহিত সাগর অক্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, এর প্রভাব এখন আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেছে।
আল-জুবার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে হুতিদের হামলা শুরুর আগে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ লোহিত সাগর দিয়ে পরিবাহিত হতো। হরমুজ প্রণালিতেও চাপ অব্যাহত থাকায় বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘ইয়েমেনের সামরিক অভিযান ইয়েমেনের নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছে’
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমির নির্দেশে গত ৪ অক্টোবর ‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’ শুরু হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তার দাবি, জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের আওতায় এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ওই অনুচ্ছেদে সশস্ত্র হামলার শিকার হলে আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলা হয়েছে।
আল-জুবা বলেন, ‘সিদ্ধান্ত ইয়েমেনের, নেতৃত্ব ইয়েমেনের, সৈন্যরাও ইয়েমেনের।’
তিনি জানান, ইয়েমেনের নিয়মিত সেনাবাহিনী, জায়ান্টস ব্রিগেড ও নেশনস শিল্ড ফোর্সেসসহ বিভিন্ন বাহিনী একটি সমন্বিত কমান্ডের অধীনে কাজ করছে। ইয়েমেনে বৈধ সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত জোটের অংশীদাররা বিমান সহায়তা দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তার বক্তব্য, জোটের মূল লক্ষ্য ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করা, তাদের পরিবর্তে যুদ্ধ পরিচালনা করা নয়।
আল-জুবার দাবি, সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অবস্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। তা সত্ত্বেও তাইজ, মারিব, হুদাইদাহ এবং পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এটি সহজ যুদ্ধ নয়, কিন্তু এই যুদ্ধ অপরিহার্য।’
তাইজে অবরোধ, মানবিক সংকটের আশঙ্কা
ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ২০২২ সালের পর থেকে সরকার যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে চললেও হুতিরা দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করেছে এবং তেল ও গ্যাস রফতানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর ফলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে দাবি তার।
তাইজ প্রদেশে হুতিদের দীর্ঘস্থায়ী অবরোধকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেন আল-জুবা।
তার আশঙ্কা, পানি, জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ বন্ধ থাকায় আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে শত শত কিডনি রোগী ডায়ালাইসিসের সুযোগ হারাতে পারেন।
তিনি জানান, হাসপাতাল ও পানি সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে শহরটিতে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার। পাশাপাশি খাদ্য ও পানি সরবরাহের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে।
আল-জুবার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ উত্তেজনা শুরুর পর থেকে ইয়েমেনে দুই লাখ ১৭ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। হুতিদের বিরুদ্ধে মানবিক সহায়তা সরিয়ে নেওয়া, ত্রাণ কার্যক্রমে বাধা দেওয়া এবং জাতিসংঘের ৭২ জন কর্মীকে আটক রাখার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আরও সহায়তা চাইল ইয়েমেন
হুতিদের অর্থায়নকারী ব্যক্তি, জাহাজ চলাচলের নেটওয়ার্ক, ভুয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং অস্ত্র সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আল-জুবা।
একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ক্ষেত্রে দুর্বলতা দূর করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ইয়েমেনের সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে গোয়েন্দা তথ্য, প্রশিক্ষণ এবং সরঞ্জাম সরবরাহের অনুরোধও জানান দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তার মতে, সংঘাতের যেকোনো রাজনৈতিক সমাধানে হুতিদের নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে সম্মত শর্তাবলি এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২২১৬ নম্বর প্রস্তাব অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
লেবাননে হিজবুল্লাহর প্রভাবের উদাহরণ টেনে আল-জুবা বলেন, ইয়েমেন এমন পরিস্থিতি চায় না, যেখানে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্রের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
তিনি বলেন, এটি সমান বৈধতা থাকা দুটি কর্তৃপক্ষের মধ্যে সংঘাত নয়। হুতিরা একটি সন্ত্রাসী মিলিশিয়া, যারা শক্তি প্রয়োগ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ভূখণ্ড দখল করেছে এবং ইয়েমেনের জনগণকে জিম্মি করে রেখেছে।
তবে ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এসব বক্তব্য ও অভিযোগের বিষয়ে হুতি বা ইরানের পাল্টা বক্তব্য এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ