আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতির আবহে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপনে প্রস্তুত পিরোজপুর জেলা। এবার জেলার ৭টি উপজেলায় মোট ৪৬২টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে মঠবাড়িয়া উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের কবুতরখালী গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘রাজ মন্দির’ বরিশাল বিভাগ তথা পুরো দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও ব্যতিক্রমী আয়োজন দিয়ে দেশজুড়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ভারতের আদলে টেরাকোটার তৈরি জোড়া প্রতিমাসহ এখানে মোট ১৬০টি প্রতিমা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দুর্গার নানারূপ, যা ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
রাজ মন্দিরের আয়োজকরা জানান, গত ছয় মাস ধরে একটানা কাজ করে ২০ জন শিল্পী ১৬০টি প্রতিমা তৈরি সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে ভারতের আদলে টেরাকোটার তৈরি প্রতিমা এবারই প্রথম বাংলাদেশের কোনো পূজা মণ্ডপে স্থান পেল। দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে এখানে ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
পূজার পুরো সময় জুড়ে মন্দিরে থাকছে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র, দর্শনার্থী মায়েদের জন্য ডেডিকেটেড ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ ও নিয়মিত স্যানিটারি প্যাড বিতরণ দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা কার্যক্রম, আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য মহাপ্রসাদ ও খাবারের বিশেষ ব্যবস্থা, বিশ্বজুড়ে খ্যাতি ও দর্শনার্থীদের ভিড়।
২০১০ সালে কার্যক্রম শুরু হলেও ২০১৬ সাল থেকে ৪০টি প্রতিমা নিয়ে বর্তমান পরিসরে পূজার আয়োজন শুরু করেন উদ্যোক্তা সুদীপ-স্নিগ্ধা দম্পতি। এরপর থেকে প্রতিবছরই এর পরিধি বেড়েই চলেছে। প্রতিবছর এই মন্দিরে ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, নেপালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও পর্যটকরা ভিড় জমান। উৎসবের দিনগুলোতে এখানে প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। গত বছর নয়া দিল্লি, কলকাতা, জাপান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগন্তুক পর্যটকরা এই মন্দিরের মুগ্ধতা প্রকাশ করে তাদের মন্তব্য নোটবুকে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
রাজ মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ও অর্থোপেডিকস বিশেষজ্ঞ ডা. সুদীপ কুমার হালদার বলেন, মন্দিরের বিশাল আঙিনাজুড়ে তৈরি প্যান্ডেলে সারিবদ্ধভাবে ১৬০টি দেব-দেবীর প্রতিমা সাজানো হয়েছে। এছাড়া ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে দেশের গুণিজনদের ছবি ও অনুপ্রেরণামূলক বাণী বিভিন্ন গাছে ও প্যান্ডেলে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রধান প্রতিমা শিল্পী উজ্জ্বল বিশ্বাস গুরু জানান, দীর্ঘ চার থেকে পাঁচ মাসের পরিশ্রমে তারা এই শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তুলেছেন। তার জানামতে এত বড় ও ব্যতিক্রমী আয়োজন আর কোথাও হয়নি।
রাজমন্দির পরিচালকদের একজন ও কলেজ শিক্ষক পলাশ চন্দ্র গাইন বলেন, দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম এক মহামিলনের তীর্থস্থান এই রাজমন্দির। দেশ-বিদেশ থেকে আসা লাখো মানুষের পদচারণায় এটি এক অন্যরকম রূপ নেয়।
মন্দিরের সেক্রেটারি সুমন হালদার জানান, পাঁচ দিনের এই উৎসবে কয়েক লাখ মানুষের ঢল নামে এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি রাখা হয় না।
পিরোজপুরের শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার বিষয়ে পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা পরিকল্পনা। পূজা উদ্যাপন পরিষদের সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা করা হয়েছে। বেশিরভাগ মণ্ডপ সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে পোশাকধারী পুলিশ ও স্ট্রাইকিং টিম মোতায়েন থাকবে। এছাড়া প্রতিমা বিসর্জনের দিনেও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সময়ের আলো/জোই