একসময় শিশুদের কল্পনা, আনন্দ, বেড়ে ওঠা ও জীবনের নানা গল্প নিয়ে বলিউডে নির্মিত হতো একের পর এক স্মরণীয় সিনেমা। ‘মাকড়ি’, ‘তারে জমিন পার’ ও ‘স্ট্যানলি কা ডাব্বা’র মতো চলচ্চিত্র দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারা। বড় তারকা ও বাণিজ্যিক সাফল্যনির্ভর সিনেমার ভিড়ে ক্রমেই কমে আসছে শিশুদের কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা।
প্রশ্ন উঠছে, বলিউডে শিশুতোষ সিনেমার এই সংকট কেন?
চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এর অন্যতম কারণ বক্স অফিসে সাফল্যের নিশ্চয়তাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া। বর্তমানে প্রযোজকেরা বড় তারকা, জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ও পরিচিত গল্পের ওপর বেশি নির্ভর করছেন। ফলে শিশুদের দৈনন্দিন জীবন, কল্পনা ও বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত মৌলিক গল্পগুলো অর্থায়ন পেতে বাধার মুখে পড়ছে।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ ‘লিটল থমাস’। কৌশল ওজা পরিচালিত সিনেমাটির গল্প আট বছর বয়সি এক শিশুকে ঘিরে, যে বাবা-মাকে একটি ভাই বা বোন এনে দেওয়ার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করে। তবে সিনেমাটি নির্মাণের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পরিচালককে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
শিশুতোষ চলচ্চিত্রের এই সংকটের পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবকেও দায়ী করেছেন পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ। একসময় শিশুদের জন্য সিনেমা নির্মাণ ও সেগুলোর প্রচার-প্রদর্শনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি ইন্ডিয়া (সিএফএসআই)। ২০২২ সালে সংস্থাটি ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (এনএফডিসি)-এর সঙ্গে একীভূত হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশুতোষ চলচ্চিত্রের বিকাশে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে বদলে গেছে শিশুদের বিনোদনের রুচিও। এখন তারা ‘পুষ্পা’র মতো জনপ্রিয় অ্যাকশনধর্মী সিনেমা এবং বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও আগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে শিশুদের উপযোগী গল্প নির্মাণের পাশাপাশি তাদের মনোযোগ আকর্ষণের বিষয়টিও নির্মাতাদের বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
তবে শিশুতোষ চলচ্চিত্রের বাজার পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি বলে মনে করেন প্রযোজক রঞ্জন সিং। তাঁর মতে, এ ধরনের সিনেমার জন্য প্রয়োজন কার্যকর বিপণন ও উপযুক্ত প্রদর্শনব্যবস্থা। সকালের ও দুপুরের শো চালু করা, স্কুলের ছুটির সঙ্গে মিল রেখে সিনেমা মুক্তি দেওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রচারের ব্যবস্থা করা গেলে শিশু ও পরিবারের দর্শক টানার সুযোগ বাড়বে।
বর্তমানে ভারতীয় শিশুতোষ চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর। অন্যদিকে, শিশুদের দৈনন্দিন জীবন, বন্ধুত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা ও কল্পনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত মৌলিক সিনেমার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
অথচ ‘মাকড়ি’ ও ‘তারে জমিন পার’-এর মতো সিনেমা দেখিয়েছে, শিশুদের জীবন ও অনুভূতির গল্পও সব বয়সী দর্শকের হৃদয় ছুঁতে পারে। তাই বলিউডে শিশুতোষ চলচ্চিত্রের বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন নতুন ও মৌলিক গল্পের প্রতি আগ্রহ, প্রযোজকদের ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা এবং শিশুদের স্বতন্ত্র দর্শক হিসেবে বিবেচনা করা।
শিশুদের জন্য সিনেমা নির্মাণ কেবল একটি বিশেষ শ্রেণির দর্শককে বিনোদন দেওয়া নয়; বরং তাদের অনুভূতি, কল্পনা ও অভিজ্ঞতাকে বড় পর্দায় তুলে ধরারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সেই জায়গা পুনরুদ্ধার করতে পারলেই হয়তো বলিউডে আবারও ফিরবে শিশুতোষ সিনেমার সোনালি দিন।
সূত্র : হিন্দুস্তান টাইমস
সময়ের আলো/জেডি