‘আমরা যারা নিজের সিদ্ধান্তে এখানে এসেছিলাম, তাদের অনেকেই হয়তো ভাবিনি বাস্তবতা এতটা কঠিন হবে। এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া— বেঁচে থাকা, আর এক দিন নিরাপদে নিজের আপনজনদের কাছে ফিরে যাওয়া।’
আক্ষেপ করে কথাগুলো বলেন অর্থের লোভে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে যাওয়া তরুণ রাজন। তিনি প্রায় ১০ মাস ধরে সেখানে আছেন।
স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যাওয়া আরেক বাংলাদেশি তরুণ আহমেদের কণ্ঠেও ঝরেছে ভুলের অনুশোচনা। তিনি বলেন, ‘এখানে ঘুম নেই, শান্তি নেই, আছে শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা, আগামী সকালটা দেখার অপেক্ষা। পরিবারকে ভালো রাখতে রাশিয়ায় যুদ্ধে এলে শেষ পরিণতি মৃত্যু। হয়তো মরদেহটাও পরিবার পাবে না। দিনশেষে পরিবারও ভালো থাকবে না, আপনিও বাঁচতে পারবেন না।’
স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় রাশিয়ায় যুদ্ধে যাওয়া অনেক বাংলাদেশি তরুণের কণ্ঠেই এখন এমন আর্তনাদ আর হাহাকার ভেসে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তারা সবাইকে সতর্ক করছেন, অর্থের লোভ কিংবা দালালদের প্রলোভনে পড়ে কেউ যেন সেখানে না যান।
শুধু দালালদের প্রলোভনে পড়ে নয়, অর্থের লোভেও অনেক বাংলাদেশি তরুণ স্বেচ্ছায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে অংশ নিচ্ছেন। স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ভয়াবহ যুদ্ধের ময়দানে। ব্যবহার করা হচ্ছে ‘টোপ’ হিসেবে।
এখন পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশি এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং কতজনের মৃত্যু হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
তবে সেখানে যুদ্ধরত বাংলাদেশিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত নিজেদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন। সবাইকে সতর্ক করছেন যুদ্ধে না আসার জন্য।
তাদেরই একজন রাজন। তিনি তার ফেসবুক পেজ ‘রাজন অন দ্য গো-বাংলা’র মাধ্যমে যুদ্ধে আসার পরিণতির কথা তুলে ধরছেন। তার মতো আরও অনেকেই এভাবে সবাইকে সতর্ক করছেন।
রাশিয়ায় যুদ্ধরত বাংলাদেশি তরুণ-যুবকদের কাছ থেকে জানা যায়, প্রধানত তিনভাবে তারা রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিতে এসেছেন। কেউ এসেছেন স্বেচ্ছায়, জেনে-বুঝে। তবে সেখানে আসার পর তাদের ভুল ভাঙে। আসার আগে তারা কল্পনাও করতে পারেননি, যুদ্ধের ভয়াবহতা এত তীব্র হতে পারে।
আরেক শ্রেণির বাংলাদেশি রাশিয়ায় এসেছেন প্রতারিত হয়ে। বাংলাদেশি দালালরা তাদের অন্য কাজের কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিচ্ছেন।
তৃতীয় একটি দল এসেছে দালালদের প্রলোভনে পড়ে। এসব তরুণের মতে, রাশিয়ার বিভিন্ন সেনাক্যাম্পে রুশ কমান্ডারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব ভিডিও বার্তায় যুদ্ধকে প্রমোট করা হচ্ছে। ভিডিওগুলোতে দেখানো হচ্ছে, তারা রাশিয়ায় যুদ্ধে এসে গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়েছেন, পরিবার নিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছেন এবং যুদ্ধে যোগ দিয়েই ৪০ লাখ টাকা পেয়েছেন। তাদের জীবন বদলে গেছে। এ ধরনের বিভিন্ন বার্তা দিয়ে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে বাংলাদেশি বেকার যুবকদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে বলে জানা যায়।
এমনই একটি ভিডিও কনটেন্টে রাশিয়ায় অবস্থানরত এক বাংলাদেশি তরুণকে বলতে শোনা যায়, ‘অনেকে বলেন আমরা নাকি ভাড়াটিয়া সৈনিক! ভাই, টাকা ছাড়া এই দুনিয়ায় কে কাজ করে? বেনিফিট ছাড়া কেউ কি কাজ করে? তবে এখানে কাজ করছি; কারণ এখানে সবচেয়ে বেশি বেতন, যা আমাদের দেশ থেকে কখনোই দেওয়া হতো না! জয়েন করেই বাংলাদেশি টাকায় ৪০ লাখ টাকা পেয়েছি।’
এ প্রসঙ্গে স্বেচ্ছায় রাশিয়ায় যুদ্ধে যাওয়া তরুণ রাজন বলেন, সোহেল সরদার নীরব নামে এক ব্যক্তি যুদ্ধে এসে সম্মান, টাকাসহ অনেক কিছু পেয়েছেন বলে প্রলুব্ধ করে ভিডিও ধারণ করছেন এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তার মতো অনেকে এভাবে যুদ্ধকে রোমাঞ্চকর করে প্রমোট করছেন।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের জীবনটা এতটাই কষ্টের যে, মাঝে মাঝে মনে হয়— এই জীবন যেন কুকুরের জীবনের চেয়েও খারাপ। এখানে নেই শান্তিতে ঘুমানোর নিশ্চয়তা, নেই আগামীকালটা বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। প্রতিটি মুহূর্ত কাটে ভয়, অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। যুদ্ধ মানুষকে শুধু শারীরিকভাবে নয়, ভেতর থেকেও ভেঙে দেয়।
অভিযোগের বিষয়ে সোহেল সরদার নীরবের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
রাশিয়াতে যুদ্ধরত বাংলাদেশি তরুণদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও বলেন, রাশিয়ায় প্রতিটি মুহূর্ত কাটে ড্রোন হামলার ভয়ে। মৃত্যু যেন পদে পদে তাড়া করে বেড়ায়। সেই সঙ্গে প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র শীত এবং খাবারের কষ্ট তো আছেই। দুদিনে একবার গোসল করার নিয়ম থাকলেও অনেকেই ১৫ দিনেও একবার গোসলের সুযোগ পায় না।
এ ছাড়া রয়েছে অর্থ হারানোর ভয়। তারা বলেন, যে অর্থের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাশিয়ায় এসেছেন, সেই অর্থও অনেক সময় কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সেখানকার রুশ কমান্ডাররা জোর করে ভাড়াটে সৈনিকদের কাছ থেকে অর্থ কেড়ে নেন। এ ক্ষেত্রে তাদের কিছুই করার থাকে না। রাজন জানান, তার প্রায় এক মিলিয়ন রুবল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় এক কোটি টাকা, সেখানকার একজন কমান্ডার কেড়ে নিয়েছেন।
রাশিয়ায় যুদ্ধে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি নিখোঁজ রয়েছেন বলেও জানা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে এক বাংলাদেশি তরুণকে ভীত কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, ‘আমি এখানে এখন ফ্রন্ট লাইনে আছি। এখানকার অবস্থা ভয়াবহ। প্রতি ৫ মিনিটে ৩/৪টা করে ড্রোন আসছে। এসব ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করা অসম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ৭ জন এজেন্সির মাধ্যমে ধোঁকা খেয়ে যুদ্ধে আসি। এর মধ্যে তিনজন মারা যায়। তারা হলেন— মাদারীপুরের সরজি কাজি, কুমিল্লার ইউসুফ খান ও কিশোরগঞ্জের জাহাঙ্গীর হোসেন।’
দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হয়ে রাশিয়ায় যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আল মনোয়ারা এজেন্সি ও আরাফাত এজেন্সিসহ আরও একটি এজেন্সি রাশিয়ায় লোক পাঠাচ্ছে। আরাফাত এজেন্সির রাজধানীর দিয়াবাড়ীতে ট্রেনিং সেন্টার আছে। তিনি আরিফ চৌধুরী ও জালাল পাটোয়ারীর নাম উল্লেখ করেন। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।
ওই তরুণ আরও বলেন, ‘এরা রাশিয়াতে লোক পাঠায়। যে কোম্পানিতে পাঠায় তারা বেতন দেয় না। পরে ছলে-বলে সেনাবাহিনীতে পাঠানো হয়। একজন লোক পাঠাতে পারলে ৫ লাখ ৮০ হাজার রুবল দেওয়া হয় দালালদের। ১০ জন লোক যুদ্ধে পাঠাতে পারলে সেখানে দালালদের থাকার জায়গা ও পরিবার নিয়ে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। রাশিয়ায় বিভিন্ন কাজের নাম করে নিয়ে আসা বাংলাদেশিদের ৩০-৪০ শতাংশ লোককে যুদ্ধে পাঠানো হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে একবার এলে আর বের হওয়ার কোনো উপায় থাকে না। এক বছরে মাত্র ২ বার বের করা হয়। একবার মেডিকেল করার জন্য আরেকবার ফিঙ্গার প্রিন্ট দিতে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে নেওয়া হয়।’
রাশিয়ায় স্বেচ্ছায় যুদ্ধে আসা আহমেদ নামে আরেক বাংলাদেশি যুবক বলেন, তিনি টাকার জন্য নিজের ইচ্ছায় রাশিয়ায় যুদ্ধ করতে এসেছেন। তবে এসে অনেক বড় ভুল করেছেন বলে অনুশোচনা করেন তিনি।
আহমেদ বলেন, ‘প্রতিদিন মৃত্যুর ভয়কে সামনে রেখে বেঁচে থাকা কতটা যন্ত্রণার, সেটা যুদ্ধে না এলে হয়তো কোনোদিন বুঝতেই পারতাম না। এখানে চোখ বন্ধ করলেও শান্তি নেই, ঘুম এলেও নিশ্চিন্ততা নেই। যেকোনো মুহূর্তে কী হবে— সেই চিন্তাটা মাথার ভেতর ঘুরতেই থাকে। ঘুম নেই, শান্তি নেই— আছে শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা আর আগামী সকালটা দেখার অপেক্ষা।’
রাশিয়ায় যুদ্ধরত ভাড়াটে বাংলাদেশি সৈনিকরা বলেন, সেখানে মারা গেলে মরদেহটাও বাড়িতে যাবে না। পথে পথে শত শত মরদেহ পড়ে থাকে। সেগুলো মাটিচাপাও দেওয়া হয় না। কালো পলিথিনে মরদেহ স্কচটেপ দিয়ে মুড়িয়ে রাস্তার এক পাশে ফেলে রাখা হয়।
তারা বলেন, ‘এখান থেকে বের হওয়াও কঠিন, টিকে থাকা আরও বেশি কঠিন।’ সবাইকে সতর্ক করে তারা বলেন, যুদ্ধের অবস্থা ভয়াবহ। স্বেচ্ছায় বা প্ররোচনায় কেউ যেন সেখানে না আসেন। সেখানে ‘সেফ জোন’ বলে কিছু নেই। যদিও নিরাপদ স্থানে রাখার কথা বলে দালালরা বাংলাদেশিদের সেখানে নিয়ে আসেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফ্রন্ট লাইনে যেতেই হয়।
তারা বলেন, ‘পরিবারকে ভালো রাখার জন্য আসবেন কিন্তু দিন শেষে আপনিও বেঁচে থাকবেন না, পরিবারও ভালো থাকবে না।’
তারা আরও বলেন, ‘আমরা যারা নিজের সিদ্ধান্তে এখানে এসেছিলাম, তাদের অনেকেই হয়তো ভাবিনি বাস্তবতা এতটা কঠিন হবে। এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া— বেঁচে থাকা, আর এক দিন নিরাপদে নিজের আপনজনদের কাছে ফিরে যাওয়া।’
অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাশিয়ায় যুদ্ধরত বাংলাদেশিদের কাছে নিখোঁজ স্বজনদের ছবি দিয়ে তাদের খোঁজ দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন।
উম্মে শাহজাদি তার স্বামীর খোঁজে এবং আহমেদ সোহেল তার মামাতো ভাই নয়নের খোঁজে পোস্ট দিয়েছেন। ইব্রাহিম শান্ত তার বোনজামাইয়ের ছবি পোস্ট করে জানান, তিনি ছয় মাস ধরে রাশিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন। তানজিনা ইসলাম জানান, তার স্বামী ফেব্রুয়ারিতে ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধে যাওয়ার পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। শামী নামে একজন জানান, তার ভাই রুবেল রাশিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন। কিশোরগঞ্জের ফায়জুলও নিখোঁজ রয়েছেন।
শুধু বাংলাদেশিরাই নন, কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুন্ডি, ফিলিপাইন, ইয়েমেন, সুদান, কিউবা, পেরু, জিম্বাবুয়ে, চাদ, বেনিনসহ বিশ্বের অনেক দেশের তরুণ-যুবকরাও দালালদের খপ্পরে পড়ে কিংবা অর্থের প্রলোভনে যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন বলে বাংলাদেশিদের সূত্রে জানা যায়।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করলে বড় ধরনের সংঘাতের সৃষ্টি হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে রাশিয়ার বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে শ্রমিকসংকট প্রকট হতে থাকে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে এক বছরেই দেশটিতে গেছেন ৩ হাজার ৭১০ জন বাংলাদেশি, যা বিগত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৮ হাজার ৬১৮ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে রাশিয়ায় গিয়েছেন।
গত ৯ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বর্তমানে রাশিয়ায় প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। তবে তাদের মধ্যে কতজন যুদ্ধে গিয়েছেন, তার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। পুলিশের গোয়েন্দা সূত্রের ধারণা, গত চার বছরে রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে ৫০ জনের বেশি বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে