বিশ্বব্যাংক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কৃষকের খামার থেকে শুরু করে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পুরো সরবরাহ প্রক্রিয়ায় বছরে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য নষ্ট ও অপচয় হয়। অথচ দেশে এখনও প্রায় দেড় কোটির বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এ সময় তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে। এই অবস্থায় অপচয় রোধ করলে এবং সুষম বণ্টন করতে পারলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মত বিশ্লেষকদের।
এ রকম পরিস্থিতির মধ্যেই আজ শুক্রবার অনুষ্ঠিত হবে বিশ্ব খাদ্য দিবস। প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হয়। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিনটিকে স্মরণ করে এই দিবসটি পালন করা হয়। এ দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে— ক্ষুধা ও দারিদ্র্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সবার জন্য পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য : ‘ইনোভেট টুডে, নারিশ টুমরো’ বা ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’। দিবসটি ঘিরে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় দেশের ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ : বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এ সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত সবশেষ ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশনের (আইপিসি) তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বিষয়ক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার, সেভ দ্য চিলড্রেন ও গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন (গেইন) যৌথভাবে এ বিশ্লেষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে থেকে আগস্ট সময়ে বিশ্লেষণের আওতাভুক্ত জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ উচ্চমাত্রার তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় (আইপিসি ফেজ-৩ বা তার বেশি) ভুগছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ জরুরি অবস্থার (আইপিসি ফেজ-৪) মুখোমুখি।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এ সময় তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ জরুরি অবস্থার মুখে পড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিকূল জলবায়ু, বন্যা, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এসব কারণে আরও লাখো মানুষের পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য কেনার সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
খাদ্য প্যাকেটে হস্তক্ষেপমুক্ত সতর্কতা লেবেল চালুর দাবি : এদিকে বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রাককালে খাদ্য প্যাকেটে হস্তক্ষেপমুক্ত সতর্কতা লেবেল চালুর দাবি জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অতি-প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে খাদ্যজনিত বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি। খাদ্য প্যাকেটের সামনে সহজ, স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণভিত্তিক ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) এ ক্ষেত্রে ভোক্তার সচেতন খাদ্য নির্বাচন সহজীকরণ এবং খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তবে খাদ্য শিল্পের নানামুখী চাপে এফওপিএল সংক্রান্ত ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা ২০২৬’-এর খসড়াটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এটি দ্রুত চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।
বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহযোগিতায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত ‘অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য প্যাকেটের সামনে সতর্কতামূলক লেবেল : অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এসব তথ্য ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘খসড়াটি বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দিয়েছি এবং ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর সঙ্গেও কাজ করছি। আশা করছি এটি দ্রুত গেজেট আকারে প্রকাশ করা সম্ভব হবে।’
জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে, যার অন্যতম কারণ অনিরাপদ খাদ্যগ্রহণ। বাধ্যতামূলক এফওপিএল খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে, তাই কোম্পানির হস্তক্ষেপমুক্ত থেকে খসড়া প্রবিধানমালাটি দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে