আশ্বিনের শেষ বেলা। ক্যালেন্ডারের পাতায় কার্তিক আসতে বাকি আর মাত্র দু-একদিন। তবে প্রকৃতির পালাবদলের হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। উত্তরের হিমপ্রবণ জেলা পঞ্চগড়ে এরই মধ্যে বেজে উঠেছে শীতের আগমনী বার্তা। ভোরের আকাশে মেঘের ওড়াউড়ি পেরিয়ে এখন চারপাশ মুড়ে থাকছে কুয়াশায়। ঘাসের ডগায় মুক্তার মতো জমে থাকা শিশিরবিন্দু জানান দিচ্ছে—দরজায় কড়া নাড়ছে শীত।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ভোরে পঞ্চগড়ের জনপদ এক মায়াবী কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছিল। ভোরের আলো ফুটলেও সকাল সাতটা পর্যন্ত চারপাশ ছিল ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। মহাসড়কগুলোতে দূরপাল্লার বাস ও স্থানীয় যানগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। উত্তরের এই জনপদে শীতের এমন আগাম উপস্থিতি যেমন প্রকৃতিতে এনে দিয়েছে বৈচিত্র্য, তেমনি জনজীবনেও শুরু হয়ে গেছে শীতের প্রস্তুতি।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ভোরে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ এর আগের দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনের বেলা রোদের তেজ থাকলেও মধ্যরাতের পর থেকেই বদলে যাচ্ছে আবহাওয়ার রূপ।
শহরের রিকশাচালক ও প্রান্তিক কৃষকদের ভাষ্য, এখন রাতে আর ফ্যান চালানোর প্রয়োজন পড়ছে না। মধ্যরাতের পর গায়ে জড়াতে হচ্ছে হালকা কাঁথা বা পাতলা কম্বল। বিশেষ করে ভোরবেলার উত্তরের হিমেল হাওয়া শীতের স্পষ্ট পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে শরীরে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পঞ্চগড়কে বলা হয় বাংলাদেশের ‘শীতের রাজধানী’। তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট থেকে আকাশপথে হিমালয়ের পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার দূরত্ব মাত্র ১১ কিলোমিটার। এছাড়া ভারতের শিলিগুড়ি মাত্র ১০ ও দার্জিলিং ৫৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। হিমালয় ও মেঘালয় পাহাড়ঘেঁষা এই অঞ্চল দিয়ে হিমেল বায়ু সবার আগে প্রবেশ করে। আবহাওয়াবিদদের মতে, কাশ্মীর ও দিল্লির শীতের একটি অংশ পশ্চিমবঙ্গ হয়ে পঞ্চগড় দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে শীতের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব সবসময়ই বেশি থাকে।
স্মৃতি হাতড়ালে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা নেমেছিল মাত্র ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।
গত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পঞ্চগড়ের প্রকৃতিতে। এবার বর্ষা মৌসুমেও ভোরের দিকে কুয়াশা দেখা গেছে, যা কিছুটা অস্বাভাবিক। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ঋতুচক্রের চিরচেনা রূপ বদলে যাচ্ছে। মহাসাগরীয় আবহাওয়ার আচরণ পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রার এমন আকস্মিক ওঠানামা ঘটছে।
এদিকে কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে পাথর শ্রমিকদের গায়ে হালকা গরম কাপড় জড়িয়ে নদীতে নামতে দেখা গেছে। চা শ্রমিকেরাও শীতের আমেজ নিয়ে হাত রাখছেন শিশিরভেজা সবুজ পাতায়।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, মৌসুমি বায়ুর নিষ্ক্রিয়তার কারণে এ অঞ্চলে শীতের আবহ তৈরি হয়েছে। ভোরে কুয়াশা দেখা দিলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কেটে যাচ্ছে। তবে তাপমাত্রা ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসা মানেই ঋতু পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা।
আশ্বিনের বিদায়বেলায় কুয়াশার এই ধোঁয়াশা যেন প্রকৃতির এক নীরব প্রস্তুতি—তুষারশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলঘেঁষা শীতকে বরণ করে নেওয়ার সময় এখনই।
সময়ের আলো/জোই