ভোরের আলো ফোটার আগেই জানালা খুললে চোখে পড়ে ধোঁয়াটে সাদা এক জগৎ। মাঠের কচি ধানের ডগায়, সবুজ ঘাসে আর গাছের পাতায় মুক্তোর মতো জমে আছে শিশির। বাতাসে হালকা হিমের পরশ। আশ্বিনের শেষবেলায় দিনের গরম আর ভোরের ঠান্ডার এই টানাপড়েনে গাইবান্ধাসহ উত্তরের জনপদে ঋতুবদলের ডাক এখন স্পষ্ট।
ক্যালেন্ডারের হিসাবে শীত আসতে এখনো দেরি। কিন্তু কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর আবহাওয়ার মেজাজ বদলে গেছে। বৃষ্টি থামতেই রাতের তাপমাত্রা কমেছে, ভোরের বাতাস হয়েছে শিরশিরে।
উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় গত বৃহস্পতিবার দিনভর বৃষ্টির পর শুক্রবার সকালে তাপমাত্রা নেমে আসে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আগের দিন একই সময়ে তা ছিল ২৪ ডিগ্রি। এক দিনের ব্যবধানে ১ ডিগ্রির পতন। রংপুর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ২৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। এর আগের কয়েক দিন তাপমাত্রা ২৫ থেকে ২৭ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছিল।
গাইবান্ধায় শনিবার ভোর ৫টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ছিল ঘন কুয়াশা। সড়ক-মহাসড়কে দূরপাল্লার বাসসহ প্রায় যানবাহনই হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরে চলেছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, উত্তরবঙ্গে কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টির পর এমন কুয়াশা স্বাভাবিক। তবে সেখানে তাপমাত্রা এখনো ২৩-২৪ ডিগ্রির মধ্যেই ওঠানামা করছে।
গাইবান্ধা সদরের বল্লমঝাড় ইউনিয়নের ধানঘড়া গ্রামের সাইদুর রহমান বলেন, আশ্বিনের শেষে এমন ঘন কুয়াশা গত কয়েক বছরে দেখা যায়নি। তার কথায়, কুয়াশা যেন মনে করিয়ে দেয়, শীত আসছে। এক ইজিবাইকচালকও জানালেন, এ মৌসুমে এই প্রথম কুয়াশা দেখলেন, আর ভালোই লাগছে তার।
শীতের আগাম আভাসে মানুষের মনে যেমন খুশি, তেমনি ঋতুচক্র নিয়ে ভাবনাও। পৌরএলাকার গোরস্থান পাড়া জামে মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লি শামছুল আলম বলেন, একদিন আগে বৃষ্টি, তারপর কুয়াশা। বাংলাদেশের ছয় ঋতুর হিসাব যেন কিছুটা বদলে যাচ্ছে, সব হচ্ছে একটু আগে-পিছে।
ভোরে হাঁটতে বের হওয়া উত্তম দেবগুপ্ত মনে করেন, এ সময়ে কুয়াশা পড়া প্রাকৃতিক নিয়মেই স্বাভাবিক, তবে ধীরে ধীরে পড়ার কথা। সেদিনের কুয়াশা একটু বেশিই ছিল। কলেজপাড়ার হাবিবুজ্জামানের ভাষ্য, দিনভর গরম থাকলেও সন্ধ্যার গা শিরশিরে ঠান্ডা আর ভোরের কুয়াশায় শীতের আমেজ মিলছে।
প্রতিবছরই দেশের অন্য অঞ্চলের আগে উত্তরাঞ্চলে শীতের অনুভূতি শুরু হয়। আবহাওয়া সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর বড়ো কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। হিমালয়ের পাদদেশের কাছাকাছি হওয়ায় শীত মৌসুমে উত্তরের ঠান্ডা বাতাস সহজেই এ অঞ্চলে ঢুকে পড়ে। গাইবান্ধার মতো এলাকায় তাই এর প্রভাব বেশি। কুয়াশা যুক্ত হলে ঠান্ডার অনুভূতিও বাড়ে।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েকদিন ধরেই উত্তরবঙ্গে আবহাওয়ায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভোরের দিকে। বৃহস্পতিবারের ভারী বৃষ্টিকে তারা মৌসুমি পরিবর্তনের লক্ষণ বলছেন। তাদের পূর্বাভাস, দিনের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ধীরে ধীরে আরও কমতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েকদিন মধ্যরাতের পর পাখার বাতাসেও ঠান্ডা লাগছে। অনেকে গায়ে টানছেন কাঁথা বা হালকা চাদর। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে শীতের এই আমেজ বেশি অনুভূত হচ্ছে। কেউ কেউ কুয়াশাভেজা সকালের দৃশ্য দেখতে ভোরে বেরিয়ে পড়ছেন, কেউ হাঁটছেন ধানখেতের পাশে। শিশু ও বয়স্কদের কেউ কেউ এর মধ্যেই হালকা গরম কাপড় গায়ে চড়িয়েছেন।
আবহাওয়ার বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। ঘরে ঘরে লেপ-তোশক রোদে দিয়ে বের করা হচ্ছে। হাটবাজারের গরম কাপড়ের দোকানে বাড়ছে মানুষের আনাগোনা। শীত পুরোপুরি জেঁকে বসেনি, তবে ভোরের কুয়াশা, শিশির আর হিমেল বাতাস বলে দিচ্ছে, সময় বদলাচ্ছে।
আবহাওয়া সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, কার্তিক শুরু হলে শীতের আমেজ আরও বাড়তে পারে। তত দিন দিনের গরম আর ভোরের কুয়াশার এই লুকোচুরিই চলবে। আশ্বিনের বিদায়বেলায় তাই গাইবান্ধার মানুষ কুয়াশামাখা সকাল উপভোগ করছে আর অপেক্ষায় আছে নরম-কোমল ঠান্ডার।
সময়ের আলো/জোই