গাইবান্ধার প্রত্যন্ত গ্রামের এক মোড়ে ঝুলে আছে লাল ডাকবাক্স। রং চটে ধূসর হয়ে গেছে, গায়ে মরিচার ছোপ। ভেতরে চিঠি নেই, আছে বিড়ি-সিগারেটের খোসা আর আবর্জনা। একসময় এই বাক্সের সামনে এসে মানুষ প্রিয়জনের নামে খাম ফেলত। এখন পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও কেউ ফিরে তাকায় না। আজ ৯ অক্টোবর, বিশ্ব ডাক দিবস। ১৯৬৯ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ডাক সংস্থার (ইউপিইউ) সম্মেলনে প্রস্তাব অনুমোদনের পর থেকে প্রতি বছর দিনটি পালিত হয়। কিন্তু উত্তরের কৃষিপ্রধান জেলা গাইবান্ধার ডাকঘরগুলোয় উৎসবের চিহ্ন নেই। আছে জরাজীর্ণ অবকাঠামো, নিজস্ব ঘরহীন অফিস আর সামান্য ভাতায় টিকে থাকা কর্মীদের ক্লান্তি।
চিঠির দিন ফুরিয়েছে
খামের ওপর লাল-নীল টিকেট, ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা আর দীর্ঘ অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত চিঠি হাতে পাওয়ার শিহরণ ছিল একসময় জীবনের অংশ। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতায় ধরা আছে সেই দিনের ছবি। এখন সেই জায়গা নিয়েছে মুঠোফোনের ইনবক্স, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভিডিও কল আর ই-মেইল।
ডাক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছরে ব্যক্তিগত চিঠির সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। এখন যা আসে, তার প্রায় সবই আইনি বা দাফতরিক কাগজ, আদালতের সমন, ব্যাংকের পিন কোড ও স্টেটমেন্ট, জমির পরচা, সরকারি চাকরির আবেদন। অথচ চিঠি একসময় ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছে। ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা ছিল ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক পাতার চিঠি, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি বদলে দেয়। ১৯৩৯ সালে আইনস্টাইনের চিঠি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পারমাণবিক গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৬৩ সালে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ‘লেটার ফ্রম বার্মিংহাম জেল’ হয়ে ওঠে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রেরণা।
গাইবান্ধায় ৯৮ ডাকঘরের নিজস্ব ভবন নেই
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সদর, পলাশবাড়ী, সাদুল্লাপুর, গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলায় ডাকঘর আছে মোট ১২৬টি। এর মধ্যে প্রধান ডাকঘর একটি, উপজেলা ডাকঘর ছয়টি, সাব-ডাকঘর পাঁচটি এবং শাখা ডাকঘর ১১৪টি। সংকট শাখা ডাকঘর নিয়ে। ১১৪টির মধ্যে নিজস্ব ভবন আছে মাত্র ১৬টির। বাকি ৯৮টি চলছে কর্মচারীদের বাড়ির বারান্দায়, মুদি দোকানে, চায়ের স্টলে, কসমেটিকসের দোকানে কিংবা হোমিও চিকিৎসালয়ে। সরকারি সুবিধার কমতি নেই বলেই বিষয়টি আরও বিস্ময়কর। এসব ডাকঘরে ল্যাপটপ, প্রিন্টার, স্ক্যানার ও মডেম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাখার জায়গা নেই, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণও অপ্রতুল।
পলাশবাড়ীর হালিমনগর ডাকঘরের কাজ চলে বাজারের ফাঁকা জায়গায় মাটিতে চট পেতে। ঝড়বৃষ্টিতে সব বন্ধ। যন্ত্রপাতি রাখার জায়গা নেই, চুরির ভয় আছে, প্রতিদিন হাতে করে আনতে ও বাড়িতে নিয়ে যেতে হয়। একই উপজেলার মনোহরপুর ডাকঘর চলে চায়ের দোকানের বারান্দায়। দোকান বন্ধ থাকলে পোস্টমাস্টারকে বাড়িতে বসে কাজ করতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ডাকঘর অনিয়মিত চলায় অনেকে বেসরকারি কুরিয়ারে যাচ্ছেন। চাকরির আবেদন বা চিঠি পাঠাতে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে।
সাদুল্লাপুরের ভাতগ্রাম ইউনিয়নের বকশীগঞ্জ বাজার শাখা ডাকঘর চলছে ভাড়া করা মুদি দোকানে। শাখা পোস্টমাস্টারের দৈনিক বেতন প্রায় ১৪৯ টাকা, মাস শেষে যা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪৬০ টাকায়। অথচ নিজের দোকানে বসে তিনি মাসে গড়ে ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকার ডাকটিকেট ও খাম বিক্রি করে সরকারের রাজস্ব জোগান। সাদুল্লাপুর উপজেলা ডাকঘরের পোস্টমাস্টার জানান, নয়টি শাখার মধ্যে মাত্র চারটির নিজস্ব ঘর আছে। বাকি পাঁচটি, বকশীগঞ্জ, কিশামতখেজু, ঘেগারবাজার, জামালপুর বাজার ও ভাতগ্রাম, চলছে অন্যের দোকান বা বারান্দায়। খোদ উপজেলা ডাকঘরের পলেস্তারা খসে পড়ছে, মূল ভবন জরাজীর্ণ।
সদর উপজেলার দারিয়াপুরের মকবুল হোসেন ১৯৯৬ সাল থেকে হোমিও ওষুধের দোকানে বসে ডাকটিকেট বিক্রি করছেন। মাসে প্রায় ১৮ হাজার টাকা রাজস্ব এলেও ডাকঘরের নিজস্ব ঘর দেখেননি। লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ল্যাংগাবাজার শাখা চলছে কসমেটিকস-স্টেশনারির দোকানে; বালাআটা শাখা বাড়ির আঙিনা বা বারান্দায়। বোয়ালি ইউনিয়ন ডাকঘর টিকে আছে অন্যের ছোট চালাঘরের নিচে। ফুলছড়িতে উপজেলা পোস্ট অফিস ছাড়া ছয়টি সাব-পোস্ট অফিসের কোনো ভবন নেই, চলছে ভাড়া ঘরে।
পায়ে হেঁটে বয়ে আনা ডাক
শাখা ডাকঘরে চিঠি পৌঁছানোর জন্য কোনো যানবাহন নেই। প্রধান ডাকঘর থেকে ২১ জন রানার কায়িক শ্রমে ডাক পৌঁছে দেন। জেলার ১১৪টি শাখা ডাকঘরে পোস্টমাস্টার, পোস্টম্যান ও রানার মিলিয়ে কাজ করেন তিন শতাধিক কর্মী। শাখা ডাকঘরের একজন ডাকপিয়নের মাসিক বেতন ৪ হাজার ৩৫৪ টাকা, মাস শেষে একজন রানার পান ৪ হাজার ১৭৭ টাকা। এরা অবিভাগীয় (ইডি) কর্মচারী। ভাতা এত কম যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে সংসার চালানো কঠিন। দুই ঈদেও কোনো উৎসব ভাতা মেলে না।
ঘেগারবাজার শাখার রানার নারায়ণ চন্দ্র সরকারের কথায় লুকিয়ে আছে এই কর্মীদের আক্ষেপ। অন্যের চাকরির চিঠি বিলি করলেও নিজের চাকরি জাতীয়করণের চিঠি কবে পাবেন, জানেন না। আশা ছেড়ে দিয়ে নামমাত্র ভাতায় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ অবিভাগীয় ডাক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের গাইবান্ধা জেলা নেতা সুকুমার চন্দ্র মোদক বলেন, যেখান থেকে রাজস্ব আসে, সেখানেই কোনো কার্যালয় নেই। তাদের দাবি, চাকরি জাতীয়করণ, ডাকব্যবস্থার আধুনিকায়ন, রেশন চালু ও শাখা ডাকঘরের নিজস্ব ভবন। পরিষদের জেলা উপদেষ্টা গোলাম রব্বানী মনে করিয়ে দেন, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে চাকরিপ্রার্থীদের চিঠি পাঠানো কিংবা জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে এই শাখা ডাকঘরই ভরসা। টিকিয়ে রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ দরকার।
ভবন হবে কীভাবে
গাইবান্ধা পোস্ট অফিস সূত্র জানায়, শাখা ডাকঘরের জন্য সরকারিভাবে জমি কেনার নিয়ম নেই। তবে এলাকার কেউ জমি দান করলে সেখানে পাকা ঘর নির্মাণের অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ ভবনের জন্য এলাকাবাসীকেই এগিয়ে আসতে হবে।
প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে
চিঠি কমতে থাকায় ডাক বিভাগ আর্থিক সেবায় জোর দিয়েছিল। ২০১০ সালের ২৬ মার্চ মানি অর্ডারের বদলে চালু হয় ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস (ইএমটিএস)। ২০১৬ সালে মাশুল কমে দাঁড়ায় হাজারে ১০ টাকা। তবু বিকাশ, নগদ, রকেট ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে পেরে ওঠেনি এই সেবা। বিকেল পাঁচটার পর লেনদেন বন্ধ, সাপ্তাহিক ছুটিতে সেবা নেই, সব এলাকায় এজেন্টও নেই।
ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক, প্রাইজবন্ড আর ডাক জীবনবীমাও একসময় ভরসার জায়গা ছিল। এখন পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে টিআইএন ও আয়কর রিটার্নের প্রমাণ বাধ্যতামূলক হওয়ায় প্রান্তিক গ্রাহকরা সরে যাচ্ছেন।
নতুন আশা ডিজিটাল পথে
এর মধ্যেও আস্থা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। পিওএস মেশিনে ডমেস্টিক মেইল সফ্টওয়্যার (ডিএমএস) ব্যবহার করে এখন দ্রুত চিঠি, নথি ও পার্সেল ইস্যু করা হচ্ছে। পোস্ট করার সঙ্গে সঙ্গে প্রেরক ও প্রাপকের মোবাইলে তথ্য যায়, ট্র্যাকিং নম্বর দিয়ে ওয়েবসাইটে পার্সেলের অবস্থানও দেখা যায়। এই স্বচ্ছতায় মানুষ আবার কিছুটা ভরসা পাচ্ছে।
ঘুরে দাঁড়ানোর পথ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রামীণ ডাকব্যবস্থা বাঁচাতে আধুনিক লজিস্টিকস সেবায় রূপান্তর জরুরি। ঘরহীন ডাকঘরের জন্য জমিদান ও ভবন নির্মাণে স্থানীয় উদ্যোগ, কর্মীদের ন্যায্য মজুরি ও উৎসব ভাতা, ই-কমার্সের পণ্য পরিবহনে গ্রামভিত্তিক নেটওয়ার্কের ব্যবহার এবং ২৪ ঘণ্টায় জেলা থেকে জেলায় ডাক পৌঁছানোর সুবিধার প্রচার, এসবই তাদের প্রস্তাব। যন্ত্রপাতি চালানোর প্রশিক্ষণও জরুরি। হাতে লেখা চিঠির দিন হয়তো আর ফিরবে না। তবু রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডাকঘরের ভূমিকা ফুরিয়ে যায়নি। অবকাঠামো সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন আর তৃণমূল কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করা গেলে এই প্রাচীন প্রতিষ্ঠান আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সময়ের আলো/জোই