শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, বাবার মৃত্যু, ছোট ভাইকে হারানোর শোক আর অভাবের সংসার—জীবনের একের পর এক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার আরিফ। আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়েছে পড়াশোনা, কাঁধে অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা ও নিজের সংসারের দায়িত্ব। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে দুশ্চিন্তা। তবু মানুষের কাছে হাত পাততে চান না তিনি। কসবা বাজারে ছোট্ট একটি দোকানে মোবাইলের বিভিন্ন সরঞ্জাম বিক্রি ও ওজন মাপার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন এই যুবক। তার স্বপ্ন, সামান্য সহযোগিতা পেলে ব্যবসাটি বড় করবেন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের হানিফ মিয়ার ছেলে আরিফ। দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছোট। কসবা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও আর্থিক সংকট ও পারিবারিক শোকের কারণে শেষ পর্যন্ত শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতে পারেননি। ক্যানসারে বাবা ও ছোট ভাইকে হারানোর বেদনা তাকে যেমন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে, তেমনি পরিবারের আর্থিক সংকটও তাকে ঠেলে দিয়েছে কঠিন বাস্তবতার মুখে।
২০২০ সালে একটি ছোট ওজন মাপার যন্ত্র দিয়ে উপার্জন শুরু করেন আরিফ। পরে পরিবারের খরচ মেটাতে কসবা বাজারে একটি ছোট স্টলে ব্যবসা শুরু করেন। সেখানে মোবাইলের কাভার, হেডফোন, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন। পাশাপাশি পথচারীদের ওজন মেপেও কিছু টাকা আয় করেন। প্রতিদিনের এই সামান্য উপার্জনেই চলে তার সংসার।
ব্যবসায় পণ্যের চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় প্রয়োজনীয় মালামাল কিনতে পারেন না তিনি। ফলে বাড়ছে না বিক্রিও। একদিকে অসুস্থ মা, অন্যদিকে নিজের সংসারের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে প্রতিনিয়ত টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে দিন কাটছে তার। এর মধ্যে স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা। অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন থাকলেও আর্থিক অনটন সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরিফের কাছে ছোট্ট দোকানটি কেবল জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বনও। অনেকেই তাকে ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ কটাক্ষ করে বলেছেন, ভিক্ষা ছাড়া আর কী করতে পারবা? কিন্তু এমন কথায় দমে যাননি তিনি। বরং নিজের শ্রমে উপার্জন করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কসবা বাজারের ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের কাছেও আরিফের এই সংগ্রাম পরিচিত। তার পরিশ্রম ও আত্মমর্যাদাবোধের প্রশংসা করেন তারা। একই সঙ্গে তার ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ক্রেতা ফয়েজুর রহমান বলেন, আমি আরিফের কাছ থেকে একটি মানিব্যাগ কিনেছি। ফুটপাতে এরকম ভালো জিনিস সচরাচর পাওয়া যায় না। জিনিস খুব ভালো। আরিফ এখানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছে। আমরা চাই, সরকারিভাবে যেন তাকে সহায়তা দেওয়া হয়।
আরেক ক্রেতা সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বলেন, তার বাবা নেই, মা আছেন। সঙ্গে তার পরিবারও আছে। সে ইচ্ছা করলেই মানুষের কাছে হাত পাততে পারতেন, কিন্তু সেটা না করে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
আরিফের দীর্ঘদিনের এক সহকর্মী ব্যবসায়ী বলেন, আমি তার সঙ্গে প্রায় ছয় বছর ধরে ব্যবসা করে যাচ্ছি। আরিফ মোটামুটি শিক্ষিত। সরকার যদি তাকে কোনো চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে আশা করি সে করতে পারবে। সে তার পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতেও পারবে।
পার্শ্ববর্তী ব্যবসায়ী মো. হানিফ মিয়া বলেন, আরিফ একজন প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী হয়েও সে নিজের শ্রমের বিনিময়ে হালালভাবে উপার্জন করে যাচ্ছে। সরকার তাকে সহায়তা করলে ব্যবসাটাকে আরেকটু উন্নত করতে পারত।
নিজের সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আরিফ বলেন, আমি কসবা বাজারে ২০২০ সাল থেকে ব্যবসা করে আসছি। প্রথমে ছোট্ট একটি ওজন মাপার মেশিন দিয়ে শুরু করি। পরে পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য ছোট্ট একটি স্টলে ব্যবসা শুরু করি। আমার পরিবার দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত। তাই সামান্য পুঁজি দিয়ে ব্যবসাটি শুরু করেছি। পণ্যের চাহিদা থাকলেও নানা আর্থিক সংকটের কারণে ব্যবসাটি সেভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই সহযোগিতা করেছেন, তবে সরকারিভাবে এখনো কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমি সরকার ও সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের কাছে আবেদন করছি, আমার এই ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার জন্য সামান্য কিছু হলেও অনুদান দিন। আমার মা অসুস্থ এবং স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা।
ব্যবসার প্রতি আগ্রহের কথা তুলে ধরে আরিফ বলেন, ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা করার প্রবল ইচ্ছা ছিল। আমি কসবা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। আর্থিক সমস্যা এবং ছোট ভাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর মানসিক চাপ বেড়ে যায়। পরে ২০২৪ সালে আমার বাবাও ক্যানসারে মারা যান। মানসিক চাপ ও আর্থিক সংকট—দুইয়ে মিলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি।
জীবিকার জন্য ভিক্ষার পথ বেছে না নেওয়ার কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, আমি আমার পরিবারের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। অনেকেই ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ভিক্ষা ছাড়া তুমি আর কী করতে পারবা? তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি হালালভাবে ব্যবসা করে, পরিশ্রম করে আয় করার।
আরিফের চাওয়া খুব বেশি নয়। নিজের ব্যবসা একটু বড় করা, প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে বিক্রি বাড়ানো এবং পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে চান তিনি। সরকারি সহায়তা কিংবা সামান্য পুঁজি পেলে ব্যবসাটি এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা ও পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা তার জন্য কিছুটা সহজ হবে বলে আশা করছেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আরিফের মতো পরিশ্রমী একজন মানুষ যেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকটের কারণে পিছিয়ে না পড়েন। তার যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসাটি সম্প্রসারণে সহায়তা করা গেলে তিনি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আরও একটি সুযোগ পাবেন।
কসবা উপজেলা মার্কেটের পশ্চিম কোণে ছোট্ট একটি দোকানে প্রতিদিন জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন আরিফ। প্রিয়জন হারানোর বেদনা, থেমে যাওয়া পড়াশোনা কিংবা অভাব—কোনোটিই তাকে পরিশ্রমের পথ থেকে সরাতে পারেনি। মানুষের কাছে হাত পেতে নয়, নিজের শ্রমে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চান তিনি। এখন তার সেই লড়াইকে আরও এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সামান্য পুঁজি, কর্মসংস্থানের সুযোগ ও মানবিক সহযোগিতা।
সময়ের আলো/জোই