আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেইয়ের ব্যয়সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেমেছেন দেশটির সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থায়নসংক্রান্ত আইন বাস্তবায়ন না করায় সরকারের বিরুদ্ধে জরিমানার নির্দেশ দিয়েছেন এক বিচারক। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে রাজপথের বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্স্যাক্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল সায়েন্সেস ভবনের কেন্দ্রীয় হলে জড়ো হয়ে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেন, ‘এভাবে চলতে পারে না!’ প্রেসিডেন্টের ব্যয়সংকোচন নীতির প্রতিবাদে ভবনজুড়ে টাঙানো হয়েছে অসংখ্য ব্যানার। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে এক দিনের জন্য ভবন দখলে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। আর্জেন্টিনায় জনমত গঠন ও সরকারের ওপর চাপ তৈরির ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি এটি।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আশঙ্কা, মাইলেইয়ের কৃচ্ছ্রসাধন নীতির কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ এবং বিনা মূল্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ হুমকির মুখে পড়েছে।
পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী এমিলিয়ানো গাতো আল-জাজিরাকে বলেন, বেতন দিয়ে মৌলিক চাহিদা মেটাতে না পারায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ভালো শিক্ষক দল বেঁধে চাকরি ছেড়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাচ্ছেন। বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা করার স্বপ্ন থাকলেও ব্যয় সংকোচন পরিকল্পনার কারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।
২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মাইলেই সরকার হাজার হাজার সরকারি কর্মীকে ছাঁটাই করেছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বন্ধ করেছে, ভর্তুকি কমিয়েছে এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যয় সংকুচিত করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নেওয়া এসব পদক্ষেপের ফলে মূল্যস্ফীতি কমে মাসে প্রায় ২ শতাংশে নেমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাইলেইয়ের দাবি, তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সফল হচ্ছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরে তিনি বলেন, আর্জেন্টিনার অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য গতিতে বাড়ছে এবং টানা ২৭ মাস ধরে প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। তার ভাষ্য, বর্তমানে দেশটির অর্থনীতি ঐতিহাসিক গড়ের চারগুণ গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
তবে এ নীতির প্রভাব নিয়ে আপত্তি রয়েছে বিরোধী দল, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের। তাদের মতে, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণ কর্মসূচি, পেনশনভোগী এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তার ওপর নির্ভরশীল মানুষেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
গত বছর কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের ভেটো অগ্রাহ্য করে দুটি আইন পাস করে। এর একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দ বাড়ানোর এবং অন্যটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়ে। তবে অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, তা কংগ্রেস স্পষ্ট করেনি—এ যুক্তিতে আইন দুটি বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানিয়েছে মাইলেই সরকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নসংক্রান্ত আইনের কিছু বিধান বাস্তবায়ন না করায় সরকারকে প্রতিদিন এক লাখ পেসো, অর্থাৎ প্রায় ৭০ ডলার জরিমানা করছেন এক ফেডারেল বিচারক। ওই আইনে মূল্যস্ফীতির কারণে কমে যাওয়া শিক্ষকদের বেতন ও শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পুনর্বহাল, নিয়মিত বাজেট সমন্বয় এবং গবেষণা, হাসপাতাল ও অবকাঠামোর জন্য অর্থায়নের কথা বলা হয়েছে।
আইনটি বাস্তবায়নের দাবিতে বৃহস্পতিবার বুয়েনস এইরেসের রাস্তায় নামেন হাজারো মানুষ। তারা সাধারণ ধর্মঘটেরও আহ্বান জানান। বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও পরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে, অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। কংগ্রেস ভবনের সামনের চত্বর রণক্ষেত্রের রূপ নেয়। অন্তত ২৫ জনকে আটক করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ কয়েকজন আহত হন।
বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মারিয়া তেরেসা দে হেসুস বলেন, মাসে প্রায় ৭০০ ডলার আয় করেও তার পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, শিক্ষকতা ও গবেষণা তার ভালোবাসার কাজ; কিন্তু পরিস্থিতি তাঁকে বাধ্য হয়ে প্রতিবাদে যোগ দিতে হয়েছে। তাঁর মতে, সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অথচ সরকার বিষয়টি উপেক্ষা করছে।
আর্জেন্টিনার অনেক মানুষ এখনো মাইলেইয়ের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন রাখেন। তাদের আশা, দেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, মজুরি উন্নত হবে এবং জীবনযাত্রার মান বাড়বে।
তবে অন্যদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, মাইলেই সরকার সুবিধাভোগী একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করছে, আর অর্থনৈতিক পরিকল্পনার খরচ বহন করতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে।
সময়ের আলো/জেডি