বিয়ে না করার সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকির কোনো সম্পর্ক আছে কি? যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কখনো বিয়ে করেননি, তাদের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার আগে বা বর্তমানে বিবাহিত ব্যক্তিদের তুলনায় বেশি। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৮ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ বেশি। তবে গবেষণাটি প্রমাণ করে না যে অবিবাহিত থাকার কারণেই ক্যানসার হয়। বরং জীবনযাপনের ধরন, ধূমপান, সংক্রমণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রজনন-ইতিহাসের মতো বিভিন্ন বিষয় এ পার্থক্যের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
অবিবাহিতদের ক্যানসারের হার কত বেশি?
ক্যানসার রিসার্চ কমিউনিকেশন্স সাময়িকীতে ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত গবেষণাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি অঙ্গরাজ্যের ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার তুলনা করা হয়।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, যেসব পুরুষ কখনো বিয়ে করেননি, তাদের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার আগে বা বর্তমানে বিবাহিত পুরুষদের তুলনায় ৬৮ শতাংশ বেশি। নারীদের ক্ষেত্রে এ পার্থক্য ৮৫ শতাংশ। গবেষকেরা বয়সের পার্থক্য সমন্বয় করে এই হিসাব করেছেন।
ক্যানসারের ধরনভেদেও পার্থক্য দেখা গেছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে পায়ুপথের ক্যানসার এবং নারীদের ক্ষেত্রে জরায়ুমুখের ক্যানসারে এই ব্যবধান উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ধূমপান, অ্যালকোহল ও সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রেও পার্থক্য বেশি দেখা গেছে। তবে সব ধরনের ক্যানসারে ব্যবধান সমান নয়।
বিয়ে নয়, ঝুঁকির পেছনে থাকতে পারে যেসব কারণ
গবেষকদের মতে, বৈবাহিক অবস্থার সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত বিষয় জড়িত থাকতে পারে। যেমন, ধূমপানের অভ্যাস, সংক্রমণের ঝুঁকি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ। এসব বিষয় ক্যানসারের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিবাহিত ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার বিষয়ে উৎসাহ বা সহযোগিতা পেতে পারেন। অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর ক্ষেত্রেও পরিবারের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এসব সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আলোচ্য গবেষণার ফল থেকে সরাসরি নিশ্চিত করা যায় না।
গবেষণাটির প্রধান লেখক পাওলো এস. পিনেইরো যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলার স্কুল অব মেডিসিনের সিলভেস্টার সমন্বিত ক্যানসার কেন্দ্রের গবেষক। তার গবেষণায় বৈবাহিক অবস্থাকে ক্যানসারের ঝুঁকি বোঝার একটি সামাজিক নির্দেশক হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি উঠে এসেছে। অর্থাৎ, কেউ বিবাহিত কি না, শুধু এই তথ্য দিয়ে তার ব্যক্তিগত ক্যানসারের ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না।
নারীদের ক্ষেত্রে প্রজনন-ইতিহাসের ভূমিকা
নারীদের ক্ষেত্রে প্রজনন-সম্পর্কিত কিছু বিষয় ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের ইতিহাসের সঙ্গে স্তন, ডিম্বাশয় এবং জরায়ুর অভ্যন্তরীণ আস্তরণের ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। তবে এই সম্পর্ক ক্যানসারের ধরন ও ব্যক্তির অন্যান্য বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
আলোচ্য গবেষণায় প্রজনন-ইতিহাসের বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়নি। ফলে কখনো বিয়ে না করা নারীদের মধ্যে ক্যানসারের হার বেশি পাওয়ার পেছনে গর্ভধারণ বা সন্তান জন্মদানের ইতিহাস কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এ কারণে বৈবাহিক অবস্থা ও ক্যানসারের মধ্যে দেখা দেওয়া সম্পর্ককে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
গবেষণাটি কী প্রমাণ করে, কী করে না?
এটি একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। অর্থাৎ, গবেষকেরা বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হারের তুলনা করেছেন; বিয়ে না করার কারণে ক্যানসার হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করেননি।
এ ছাড়া গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট ১২টি অঙ্গরাজ্যের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত। তাই এর ফলাফল সরাসরি বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বৈবাহিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত পার্থক্যগুলো ক্যানসার প্রতিরোধের পরিকল্পনায় বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে ধূমপান পরিহার, ক্যানসার প্রতিরোধে টিকা, উপযুক্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার মতো পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে, অবিবাহিত থাকা মানেই ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। একইভাবে, বিয়ে করলেই ক্যানসার থেকে সুরক্ষা পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। ব্যক্তিগত ঝুঁকি নির্ভর করে বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, জীবনযাপন, সংক্রমণসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর। তাই বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তে ক্যানসারের পরিচিত ঝুঁকিগুলো কমানো এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সময়ের আলো/জোই