স্মার্টফোন, ট্যাব, কম্পিউটার কিংবা টেলিভিশন এখন শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। পড়াশোনা, বিনোদন, গেম খেলা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ, নানা প্রয়োজনেই শিশুরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে। তবে প্রয়োজনের বাইরেও তারা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে ডুবে থাকে।
যা ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে এবং তা নানা সমস্যা তৈরি করচ্ছে । অনেক শিশুই খাবার সময়, ঘুমানোর আগে এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সময়ও মোবাইল বা ট্যাবে ভিডিও দেখছে নয়তো গেম খেলছে।
শিশুদের ডিভাইস ব্যবহারের এই প্রবণতা নিয়ে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি। শুধু ডিভাইস কেড়ে নেওয়া বা বকাঝকা করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। শিশুর বয়স, প্রয়োজন ও পারিবারিক পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে ধীরে ধীরে ব্যবহারের অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে।
কেন বাড়ছে নির্ভরতা?
শিশুদের কাছে মোবাইল বা ট্যাব আকর্ষণীয় হওয়ার অন্যতম কারণ এর দ্রুত পরিবর্তনশীল ছবি, ভিডিও এবং গেম। অনলাইন ভিডিও বা গেমে একের পর এক নতুন কনটেন্ট শিশুর মনোযোগ ধরে রাখে। ফলে তাদের নিজেদের কাজগুলো যেমন— পড়ালেখা, গল্পের বই পড়া বা খেলাধুলা করা অনেক সময় তাদের কাছে একঘেয়ে মনে হয়ে থাকে।
অন্যদিকে ব্যস্ততার কারণে অনেক অভিভাবক শিশুকে শান্ত রাখতে বা খাওয়ানোর সময় মোবাইল হাতে তুলে দেন। ধীরে ধীরে শিশু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একসময় ডিভাইস না পেলে কান্না, রাগ বা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকলে ঘুমের ব্যাঘাত, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, মনোযোগ ধরে রাখার অসুবিধা এবং সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার মতো বিষয় দেখা দিয়ে থাকে। তবে প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রে প্রভাব এক রকম নয়। বয়স, স্ক্রিনের ধরন এবং ব্যবহারের সময়ের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
অভ্যাস বদলানোর প্রক্রিয়া
ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রথমেই পরিবারের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা প্রয়োজন। কখন মোবাইল বা ট্যাব ব্যবহার করা যাবে এবং কতক্ষণ করা যাবে, তা শিশুকে বুঝিয়ে বলতে হবে। খাবার টেবিল, পড়ার সময় ও ঘুমের আগে ডিভাইস ব্যবহার না করার নিয়ম করা যেতে পারে।
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ওহী উদ্দীন সুমন বলেন, শুধু শিশুকে মোবাইল থেকে দূরে রাখলেই হবে না, বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থাও করতে হবে। গল্পের বই পড়া, ছবি আঁকা, খেলাধুলা, সাইকেল চালানো, ঘরের ছোটখাটো কাজে অংশ নেওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে গল্প করার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের নিজেদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবা সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকলে শিশুর কাছ থেকে ফোন দূরে রাখার অভ্যাস আশা করা কঠিন। তাই পরিবারের সবাই মিলে নির্দিষ্ট সময় ‘স্ক্রিনমুক্ত সময়’ পালন করতে পারেন। শিশুর আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে বা ডিভাইস ছাড়া স্বাভাবিক কাজকর্মে সমস্যা হলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বকাঝকা নয়, দরকার ধৈর্য
শিশুর হাতে থাকা ডিভাইস হঠাৎ কেড়ে নিলে অনেক সময় রাগ বা জেদ আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই ব্যবহারের সময় ধীরে ধীরে কমানো এবং আগে থেকেই সময় শেষ হওয়ার কথা জানানো ভালো। শিশুর ভালো আচরণ ও নিয়ম মেনে চলার প্রশংসাও করতে হবে।
শিশু যদি দীর্ঘ সময় ডিভাইস ব্যবহারের কারণে স্বাভাবিক ঘুম, পড়াশোনা, খেলাধুলা বা পারিবারিক যোগাযোগ থেকে দূরে সরে যায়, কিংবা ডিভাইস না পেলে তীব্র অস্থিরতা ও আচরণগত পরিবর্তন দেখা দেয়, তা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
প্রযুক্তি শিশুর শত্রু নয়। বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি শেখার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত ডিভাইস পুরোপুরি বন্ধ করা নয়, বরং শিশুকে প্রযুক্তির সঙ্গে স্বাস্থ্যকর ও নিয়ন্ত্রিত সম্পর্ক গড়ে তুলতে শেখানো।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও