জাবালিয়ায় নিজ বাড়িতে ইসরায়েলি হামলায় নিহত পরিবারের সদস্যদের কবর জিয়ারত করছেন মাহমুদ খালা। ছবি : আবদেলহাকিম আবু রিয়াশ/আল জাজিরা
গাজায় এখন একা ঘুরে বেড়ান মাহমুদ খাল্লা। ইসরায়েলি হামলায় স্ত্রী, তিন সন্তান, মা-বাবা, দুই ভাই ও তাদের পরিবার, বোন ও তার সন্তানসহ পরিবারের ৩৯ সদস্যকে হারিয়েছেন তিনি। ধ্বংস হয়ে গেছে তাদের পাঁচতলা বাড়িটিও। এখন প্রতিদিন সকালে কাছের কবরস্থানে গিয়ে প্রিয়জনদের কবরের পাশে কিছুটা সময় কাটান ৪০ বছর বয়সি এই ফিলিস্তিনি।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ২১ ডিসেম্বর উত্তর গাজার জাবালিয়ায় মাহমুদদের পারিবারিক বাড়িতে একসঙ্গে জড়ো হয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। ওই বাড়িতে ইসরায়েলি হামলায় ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং ভেতরে থাকা ৩৯ জন নিহত হন। হামলার কিছুক্ষণ আগে খাবারের সন্ধানে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন মাহমুদ। পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য হিসেবে বেঁচে যান তিনি।
খাবার খুঁজতে বেরিয়ে হারিয়েছেন সবাইকে
সেদিনের স্মৃতি মনে করে মাহমুদ বলেন, বাড়ির আশপাশে ইসরায়েলি ট্যাংক অবস্থান নেওয়ায় চলাচল ছিল বিপজ্জনক। অবরোধের কারণে খাবারের সংকটও তীব্র হয়ে উঠেছিল। সন্ধ্যায় পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করতে বাড়ি থেকে বের হন তিনি।
মাহমুদ আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমি তাদের বলেছিলাম, কী পাওয়া যায় তা দেখতে যাচ্ছি। বাইরে যাওয়ার প্রায় ১৫ মিনিট পরই একটি বিশাল বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই।’
তিনি দ্রুত বাড়ির দিকে ফিরে দেখেন, হামলার শিকার হয়েছে তাদেরই বাড়ি। হতবিহ্বল হয়ে পড়লেও কয়েকজন প্রতিবেশীকে সঙ্গে নিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ বেঁচে আছেন কি না, তা খুঁজতে শুরু করেন।
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হওয়া তার পারিবারিক বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মাহমুদ, যে হামলায় তার ৩৯ জন আত্মীয় নিহত হয়েছেন। ছবি : আবদেলহাকিম আবু রিয়াশ/আল জাজিরা
কিন্তু এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলা, কোয়াডকপ্টার ও নজরদারি বিমানের তৎপরতা অব্যাহত থাকায় উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। মাহমুদ জানান, তাদের লক্ষ্য করে একটি নজরদারি বিমান থেকে বোমা ফেলা হলে তারা সেখান থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। পরদিন সকালে আবার ঘটনাস্থলে ফিরে আসেন তিনি। ওই রাতে অ্যাম্বুলেন্স ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা দলের সদস্যরাও সেখানে পৌঁছাতে পারেননি।
পরদিন ধ্বংসস্তূপের কাছে দাঁড়িয়ে পরিবারের সদস্যদের ডাকলেও কেউ সাড়া দেননি। পাঁচতলা ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে কাউকে উদ্ধার করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
‘সেখানে পাঁচতলার ধ্বংসস্তূপ ছিল। আমাদের পক্ষে কাউকে বের করে আনা অসম্ভব ছিল,’ বলেন মাহমুদ।
রাস্তায় রাত কাটিয়েছেন, খুঁজেছেন আশ্রয়
পরিবার ও বাড়ি হারানোর পর মাহমুদের জীবনে নেমে আসে দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা। তার চাচারাও আগের এক হামলায় নিহত হয়েছিলেন। তাদের বাড়িতে হামলার নয় দিন পর মাহমুদদের বাড়িতে হামলা হয়। চাচাদের বাড়িতে ওই হামলায় ১৮ জন নিহত হন। পরিবারের অন্য সদস্যরা দক্ষিণ গাজায় চলে গিয়েছিলেন।
আশ্রয়হীন মাহমুদ মাসের পর মাস রাস্তায় ঘুরেছেন। কখনো রাস্তায়, কখনো খোলা গাড়িতে রাত কাটিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর মধ্যে আশ্রয় পাওয়া কঠিন ছিল, কারণ তাঁদের সঙ্গে তাঁর কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল না।
মাহমুদ তার মেয়ে হুদার একটি ছবি ধরে আছেন, যাকে তার মা ও ভাইবোনদের সাথে হত্যা করা হয়েছিল। ছবি : আব্দেলহাকিম আবু রিয়াশ/আল জাজিরা
মাহমুদ বলেন, ‘আমি রাস্তায়, কিংবা কোনো খোলা গাড়ি বা যানবাহন পেলে সেখানে ঘুমাতাম। আমি সম্পূর্ণ একা ও গৃহহীন ছিলাম।’
নিরাপদ আশ্রয় ও খাবারের সন্ধান তার কাছে প্রতিদিনের লড়াই হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আপনি জানেন না, কখন গুলি এসে লাগবে, কখন রকেট আঘাত হানবে, খাবার পাবেন কি না কিংবা রাতে কোথায় ঘুমাবেন।’
তিন মাস ধরে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করেন স্বজনদের মরদেহ
২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি শুরু করেন অনেক পরিবার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর প্রায় এক বছর পরও আনুমানিক আট হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের অনেকের মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে বা অন্য কোথাও পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বোমা হামলা কমে আসার পর মাহমুদ নিজেই পরিবারের সদস্যদের দেহাবশেষ উদ্ধারের উদ্যোগ নেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৯ মাস ধরে সেগুলো তাদের বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিল।
তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে আছে, অথচ তাদের দাফন করা হয়নি—এই চিন্তা আমাকে ভীষণ কষ্ট দিত। বিষয়টি কখনোই আমার মন থেকে সরে যায়নি।’
মাহমুদ ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে হাতে করে তার পরিবারের দেহাবশেষ উদ্ধার করেন। ছবি : আব্দেলহাকিম আবু রিয়াশ/আল জাজিরা
সহায়তার জন্য তিনি বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ, রেড ক্রস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট এবং অসংখ্য পরিবারের সহায়তার আবেদন থাকায় পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি বলে জানান তিনি।
শেষ পর্যন্ত বন্ধু ও প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় নিজের হাতে স্বজনদের দেহাবশেষ উদ্ধারের কাজ শুরু করেন মাহমুদ। চলতি বছরের মে মাসের দিকে শুরু হওয়া এ কাজ শেষ করতে তাঁর তিন মাস লেগেছিল।
তিনি বলেন, ‘কখনো এক দিনে একজনের দেহাবশেষ উদ্ধার করতে পেরেছি, কখনো লেগেছে দুই দিন।’
প্রথমে পরিবারের সঙ্গে আশ্রয় নেওয়া দুই আত্মীয়ের দেহাবশেষ উদ্ধার করেন তিনি। সবশেষে উদ্ধার করেন নিজের বোন ও তার সন্তানদের, যারা একসঙ্গে চাপা পড়েছিলেন।
উত্তর গাজার জাবালিয়া আন-নাজলা এলাকার একটি কবরস্থানে স্বজনদের দাফন করেন মাহমুদ। এখন প্রতিদিন সকালে সেখানে গিয়ে তাদের কবরের পাশে দাঁড়ান তিনি।
মাহমুদ বলেন, ‘অবশেষে যখন তাদের দাফন করতে পেরেছি, তখন অনেকটা স্বস্তি অনুভব করেছি। প্রতিদিন কাজ করে তাদের সবার দেহাবশেষ উদ্ধার করতে আমার তিন মাস লেগেছে।’