নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে লড়াই, তবু নেতানিয়াহুর পথেই ইসরায়েল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আসন্ন নির্বাচনে একজোট হচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে তাদের মধ্যে

2026-10-16T13:21:45+00:00
2026-10-16T13:21:45+00:00
 
  শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬,
৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে লড়াই, তবু নেতানিয়াহুর পথেই ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২১ পিএম 
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একজন সমর্থকের সাথে সেলফি তুলছেন। ছবি : এএফপি
ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আসন্ন নির্বাচনে একজোট হচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে তাদের মধ্যে নেতানিয়াহুবিরোধিতা ছাড়া আদর্শিক অমিল খুব বেশি নেই। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হতে পারে এমন এক বিরোধী শিবির, যার বড় অংশও ডানপন্থী, সামরিক শক্তিনির্ভর ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের অনুসারী।

আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এতে নেতানিয়াহু ও তার লিকুদ পার্টির জোটের মুখোমুখি হবে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে গঠিত নেতানিয়াহুবিরোধী শিবির। তবে এই শিবির এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো একক নেতাকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেনি। সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু এখন শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী নন; সমর্থক, বিরোধী এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অনেকের কাছেই তিনি আধুনিক ইসরায়েলের রাজনীতির প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

গত সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় বহু দেশের প্রতিনিধি প্রতিবাদ জানিয়ে অধিবেশনকক্ষ ত্যাগ করেন। তবে এতে দমে না গিয়ে তিনি উপস্থিত প্রতিনিধিদের উদ্দেশে কটাক্ষ করেন। ইসরায়েলে তার সমর্থকদের অনেকে এমন বক্তব্যকেই নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেন। তার সাবেক সহযোগী মিচেল বারাকের ভাষ্য, জাতিসংঘে নেতানিয়াহুকে এমন দৃঢ় অবস্থানে দেখতেই তার সমর্থকেরা পছন্দ করেন।

১৯৪৯ সালে তেল আবিবে জন্ম নেওয়া নেতানিয়াহু ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড রয়েছে তার। ২০২২ সালে ষষ্ঠবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ফেরেন তিনি। তার নেতৃত্বাধীন বর্তমান জোটকে ইসরায়েলের ইতিহাসে অন্যতম কট্টর ডানপন্থী সরকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গের মতে, ইসরায়েলের রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি প্রতিচ্ছবি নেতানিয়াহু। তিনি জনমতকে কাজে লাগিয়ে জোট গঠন করতে পারেন, আবার সেই জনমতকে নিজের পক্ষে প্রভাবিতও করতে পারেন।

নেতানিয়াহুর শাসনামলে ইসরায়েলের রাজনীতি আরও ডান দিকে সরে গেছে বলে মনে করেন সমালোচকেরা। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ থেকে সরে আসা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ এবং গাজায় যুদ্ধ পরিচালনা তার সরকারের নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়েও নেতানিয়াহু সমালোচনার মুখে পড়েন।

২০১৮ সালে তার সরকারের উদ্যোগে পাস হওয়া ‘নেশন-স্টেট আইন’-এ ইহুদি জনগণের জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আরবি ভাষার সরকারি ভাষার মর্যাদা বাতিল করা হয় এবং ইহুদি বসতি গড়ে তোলাকে জাতীয় মূল্যবোধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সমালোচকদের মতে, এই আইন অধিকৃত পশ্চিম তীরে বৈষম্য ও বসতি সম্প্রসারণের পরিবেশকে আরও জোরদার করেছে।

জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক সমন্বয় দফতরের (ওসিএইচএ) তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা ২০২৩ সালে ১ হাজার ২৯১টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১ হাজার ৮৩৫টিতে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ১ হাজার ৭১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৩৩টি শিশু রয়েছে।

নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের মতো কট্টর ডানপন্থী নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানও বিতর্ক তৈরি করেছে। বেন-গভির বর্ণবাদে উসকানি এবং একটি ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠীকে সমর্থনের দায়ে দণ্ডিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে স্মোটরিচ অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে পরিচিত।

বামপন্থী হাদাশ দলের বিদায়ী পার্লামেন্ট সদস্য আইদা তৌমা-স্লিমান বলেন, নেতানিয়াহু ইসরায়েলে বর্ণবাদ ও ফ্যাসিবাদ সৃষ্টি করেননি, তবে এগুলোকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর মতে, স্মোটরিচ ও বেন-গভিরের মতো নেতাদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার পরিণতি নেতানিয়াহু ভালোভাবেই জানেন।

বিচার বিভাগ সংস্কারের উদ্যোগও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তার সরকার ও ডানপন্থী মিত্ররা বিচার বিভাগের ক্ষমতা ও সরকারের ওপর আদালতের নজরদারি কমানোর লক্ষ্যে সংস্কার প্রস্তাব আনে। এর প্রতিবাদে ইসরায়েলে নজিরবিহীন বিক্ষোভ হয়; লাখো মানুষ রাস্তায় নামেন। দুর্নীতির মামলাগুলো নিয়েও নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। দোষী সাব্যস্ত হলে এসব মামলায় তার কারাদণ্ড হতে পারে।

তবে নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে বলে জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে লিকুদ পার্টি ৩২টি আসন পেয়েছিল। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দলটির সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ২০ থেকে ২২টির মধ্যে দেখা যাচ্ছে। সাবেক সমর্থকদের কেউ বিরোধী শিবিরে, আবার কেউ আরও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।


নেতানিয়াহুর সাবেক সহযোগী মিচেল বারাকের মতে, এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহু কার্যত একক প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন না; বরং তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি জোট। অন্যদিকে ফ্লাশেনবার্গের বিশ্লেষণ, নেতানিয়াহুর সমর্থকদের কাছে তিনিই এখনো ইসরায়েলকে নেতৃত্ব দেওয়ার একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি। বিরোধীদের কাছে তিনি দুর্নীতি ও ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যর্থতাসহ পরবর্তী যুদ্ধগুলোর জন্য দায়ী এক নেতা।

তবে ফ্লাশেনবার্গের মতে, নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হয়তো তার ক্ষমতায় থাকা বা না থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার বিরোধী প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরাও ডানপন্থী, সামরিক শক্তিনির্ভর এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। ফলে নেতানিয়াহুর বিরোধিতা থাকলেও ইসরায়েলের রাজনীতির মূল গতিপথে তার প্রভাব রয়ে যেতে পারে।

এ কারণেই বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নেতানিয়াহুর সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার হতে পারে এমন একটি রাজনৈতিক পরিসর, যেখানে তার বিরোধীরাও অনেক ক্ষেত্রে তারই নির্ধারণ করে দেওয়া ডানপন্থী বাস্তবতার মধ্যে রাজনীতি করছেন। 

সূত্র : আল জাজিরা 

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   নেতানিয়াহু  লড়াই  ইসরায়েল  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: