স্ত্রীর কোলে দেড় বছরের সন্তান, পাশেই সাংবাদিক স্বামীর নিথর দেহ

নেত্রকোনা প্রতিনিধি

সারাদেশ

‘বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাকে কথাগুলো

2026-10-16T14:24:05+00:00
2026-10-16T14:24:05+00:00
 
  শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬,
৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
স্ত্রীর কোলে দেড় বছরের সন্তান, পাশেই সাংবাদিক স্বামীর নিথর দেহ
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২৪ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
‘বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাকে কথাগুলো বলেই বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। কিন্তু আর ফেরা হয়নি তার। বৃহস্পতিবার রাতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় দুই সন্তানকে নিয়ে রাতের খাবার খেয়ে বসেছিলেন আনন্দিতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুনতে হয় স্বামীর মৃত্যুসংবাদ। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে স্বামীর মরদেহের পাশে বসে কাঁদছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত পৌনে আটটার দিকে দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ানকে স্ত্রীর কোলে দিয়ে বাড়ি থেকে বের হন ৪৪ বছর বয়সী লুৎফুজ্জামান। এর কিছুক্ষণ পর নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় একটি চায়ের দোকানের সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

স্বামীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন আনন্দিতা সাংমা। স্বামীর মরদেহের পাশে বসে তিনি বলেন, ‘এভাবে যে একজন মানুষকে কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলি করে মেরে ফেলবে, তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পেয়ে প্রথমে ভাবছিলাম কেউ হয়তো ফটকা ফুটাচ্ছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষ বলাবলি করল, তাকে মেরে ফেলছে।’

স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে আনন্দিতা বলেন, ‘আমি তো আমার স্বামীকে আর ফিরে পাব না। তবে যারা তাকে হত্যা করেছে, আমার অবুঝ দুটি শিশুকে পিতৃহারা করেছে, পুলিশ তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনুক। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

লুৎফুজ্জামান বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন তিনি। তার বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। বাবা মহব্বত আলী ফকির। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে দুর্গাপুরের তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে তেলনজিয়া এলাকার একটি চায়ের দোকানে চা পান করেন লুৎফুজ্জামান। সেখান থেকে বিরিশিরি উতরাইল বাজারের উদ্দেশে রওনা হন। তবে নিজের মোবাইলফোন দোকানে ফেলে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে মিনিট তিনেকের মধ্যে আবার ফিরে আসেন তিনি।

মোবাইলফোন নিয়ে দোকান থেকে বের হওয়ার সময় দুই যুবক সেখানে এসে দোকানদারের কাছে সিগারেট চান। এরপর তারা লুৎফুজ্জামানকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়েন। গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে দুই যুবক দৌড়ে পালিয়ে যান। পরে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

চায়ের দোকানি রবিন রাংসা বলেন, ‘আমি তখন চায়ের কাপ ধুচ্ছিলাম। লুৎফুজ্জামান চা খেয়ে যাওয়ার সময় মোবাইলফোন ফেলে যাওয়ায় আবার ফিরে আসেন। তিনি ফোন নিয়ে বের হওয়ার সময় দুই যুবক এসে আমার কাছে সিগারেট চায়। এরপর লুৎফুজ্জামানকে গুলি করে। আমি পরপর চারটি গুলির শব্দ শুনেছি। ভয়ে বাসায় গিয়ে ঢুকে পড়ি।’

রবিন রাংসার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই যুবকের বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর। তাদের একজনের পরনে লুঙ্গি, অন্যজনের পরনে ছিল থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। গুলি করার পর স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে তারা পালিয়ে যান। খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।

স্বজনদের বরাতে জানা গেছে, প্রায় ছয় বছর আগে তেলনজিয়া গ্রামের শিলা সাংমা ও প্রয়াত ফিলিপ রাংসার মেয়ে আনন্দিতাকে বিয়ে করেন লুৎফুজ্জামান। তাদের চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্তি ও দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান রয়েছে।

লুৎফুজ্জামানের ফুফুশাশুড়ি নিরালা রেমা ও রুলি রেমা জানান, ঘটনার সময় তারা বাড়ির বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে দোকানের কাছে গিয়ে দেখেন, লুৎফুজ্জামানের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে আছে। তার মাথা, গলা ও বুক থেকে রক্ত ঝরছিল।

এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা লুৎফুজ্জামানকে কুপিয়ে জখম করেছিল। ওই সময় তার সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়।


হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খান এবং দুর্গাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাতসহ পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর জেলার সব থানাকে সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

নিহত সাংবাদিকের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সময়ের আলো/জোই/জেডি 
  বিষয়:   স্ত্রী  সন্তান  সাংবাদিক  স্বামী  নেত্রকোনা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: