টানা দরপতনের পর ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। সদ্য বিদায়ি সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রথম দুদিন বড় দরপতনের পর শেষ তিন দিন সূচক বেড়েছে। তবে সূচকের এই পুনরুদ্ধারের মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা কাটেনি। সপ্তাহজুড়ে লেনদেন কমে যাওয়ায় বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৮ অক্টোবরের ৫ হাজার ৪৭৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট থেকে ১৫ অক্টোবর শেষে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৫২ দশমিক ০৬ পয়েন্টে। অর্থাৎ এক সপ্তাহে সূচক কমেছে ২৩ দশমিক ৫২ পয়েন্ট। একই সময়ে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৫৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহে ছিল ২ হাজার ৭৮২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অর্থাৎ আগের সপ্তাহের তুলনায় বাজার লেনদেন কমেছে ৪২৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বা ১৫ দশমিক ৪২ শতাংশ কম।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, সপ্তাহের শুরুতে দুর্বল কোম্পানির আর্থিক ফলাফল ও লভ্যাংশ নিয়ে উদ্বেগ, দেশীয় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানে রাখে। অন্যদিকে, টানা দরপতনের পর কিছু শেয়ারের দাম কমে আসায় সপ্তাহের শেষভাগে একাংশ বিনিয়োগকারী কেনাকাটায় ফিরেছেন। এতে সূচক বাড়লেও বাজারে টেকসই আস্থা ফিরে এসেছে— এমন বলতে নারাজ বাজার বিশ্লেষকরা।
প্রথম দুদিনেই সূচক হারায় ৭০ পয়েন্ট : সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস ১১ অক্টোবর ডিএসইএক্স ২৪ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট কমে প্রায় ৫ হাজার ৪৫১ পয়েন্টে নেমে আসে। এদিন ২৬২টি সিকিউরিটিজের দর কমেছিল, বেড়েছিল ৭৭টির এবং ৫৬টির দর অপরিবর্তিত ছিল। পরদিন ১২ অক্টোবর সূচক আরও ৪৬ দশমিক ১৭ পয়েন্ট হারিয়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪০৪ দশমিক ৮৭ পয়েন্টে। দুদিনে সূচক কমে প্রায় ৭০ দশমিক ৭১ পয়েন্ট। ওই দিন ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৯৫টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৩০০টির দর কমেছে, বেড়েছে মাত্র ৪৭টির এবং ৪৮টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
শেষ তিন দিনে সূচকের পুনরুদ্ধার : ১৩ অক্টোবর বাজারে সামান্য উত্থান দেখা দেয়। ওই দিন ডিএসইএক্স ৪ দশমিক ০৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৪০৮ দশমিক ৯০ পয়েন্টে দাঁড়ায়। তবে লেনদেন কমে ৪১০ কোটি টাকায় নেমে আসে। ১৪ অক্টোবর সূচক আরও ২০ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৪২৯ দশমিক ৩৭ পয়েন্টে পৌঁছায়। ওই দিন লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪১৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ১৫ অক্টোবর সূচক আরও ২২ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪৫২ দশমিক ০৬ পয়েন্টে। ওই দিন লেনদেন হয়েছে প্রায় ৪৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। সব মিলিয়ে শেষ তিন কার্যদিবসে সূচক বেড়েছে ৪৭ দশমিক ১৯ পয়েন্ট।
তবে এই উত্থান সত্ত্বেও সপ্তাহের শুরুতে সূচকের যে পতন হয়েছিল, তা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। বাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, দরপতনে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু শেয়ারের দাম আকর্ষণীয় পর্যায়ে আসায় বিনিয়োগকারীদের একাংশ সেগুলো কেনার সুযোগ নিয়েছেন। এ ধরনের কেনাকাটাকে সাধারণত দরপতনের পর কম দামে শেয়ার কেনার প্রবণতা বা ‘বার্গেইন হান্টিং’ বলা হয়। তবে এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসার সমতুল্য নয়।
লেনদেন কমেছে ১৫ শতাংশের বেশি : আলোচ্য সপ্তাহে পুঁজিবাজারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল লেনদেনের সংকোচন। ডিএসইর মূল বাজারে ১১ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৫৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহে লেনদেন হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৭৮২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ফলে এক সপ্তাহে লেনদেন কমেছে প্রায় ৪২৯ কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সঙ্গে কমেছে দৈনিক গড় লেনদেন। বিশেষ করে ১৩ ও ১৪ অক্টোবর লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪১০ কোটি ও ৪১৬ কোটি টাকা। বাজারের সাপ্তাহিক পর্যালোচনায় এই দুই দিনের লেনদেনকে প্রায় সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দরপতনের নেপথ্য কারণ : বাজারের পতন ও পরবর্তী পুনরুদ্ধার বিশ্লেষণে কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমত, কোম্পানির আর্থিক ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয়, মুনাফা ও লভ্যাংশের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক হয়ে পড়েন। ১১ অক্টোবরের বাজার পর্যালোচনায় দুর্বল করপোরেট আয় ও লভ্যাংশ ঘোষণা-সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
দ্বিতীয়ত, দেশীয় অর্থনৈতিক চাপ। ব্যবসায়িক পরিবেশ, উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা শিল্প প্রতিষ্ঠানের মুনাফার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদননির্ভর কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
তৃতীয়ত, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজার ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে। তবে আলোচ্য সপ্তাহে দেশীয় পুঁজিবাজারে এর নির্দিষ্ট প্রভাব কতটা ছিল, তা আলাদাভাবে পরিমাপ করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
চতুর্থত, বিক্রির চাপ ও নির্বাচিত কেনাকাটা। সপ্তাহের প্রথম দুই দিনে বিপুলসংখ্যক শেয়ারের দর কমেছে। পরে কিছু শেয়ারে ক্রেতা ফিরলেও সেই কেনাকাটা সব খাতে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। ফলে সূচকের পুনরুদ্ধার হলেও বাজারের সামগ্রিক প্রবণতা পুরোপুরি বদলে গেছে, এমন দাবি করা যাচ্ছে না।
দরবৃদ্ধির বিস্তার বাড়লেও আস্থা নিয়ে প্রশ্ন : ১৫ অক্টোবর ডিএসইতে লেনদেন হওয়া সিকিউরিটিজের মধ্যে ২৩৭টির দর বেড়েছে, ৮৭টির কমেছে এবং ৭১টির দর অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দরবৃদ্ধির পক্ষে বাজারের বিস্তার ছিল ইতিবাচক। ১২ অক্টোবর যেখানে ৩০০টি সিকিউরিটির দর কমেছিল, সেখানে সপ্তাহের শেষ দিনে দরবৃদ্ধি পাওয়া সিকিউরিটির সংখ্যা দরপতনের শিকার সিকিউরিটির তুলনায় অনেক বেশি ছিল। একই সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণও আগের দিনের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি আগের দুদিনের পরিস্থিতির তুলনায় স্পষ্ট পরিবর্তন।
তবে এক দিনের ইতিবাচক বাজার বিস্তার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরে আসার প্রমাণ পাওয়া যায় না। পরবর্তী কার্যদিবসগুলোতেও সূচকের সঙ্গে লেনদেন বাড়ে কি না এবং দরবৃদ্ধি কতটা বিস্তৃত থাকে, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে