মুসলিম সংস্কৃতিতে আজওয়া খেজুর অত্যন্ত পরিচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি নাম। পবিত্র মদিনা মুসলমানদের আবেগ ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু, আর এর অন্যতম প্রধান নিদর্শন হলো এই আজওয়া খেজুর। অনন্য ও সুমিষ্ট স্বাদের জন্য বিশ্বজুড়ে এর বিশেষ সুনাম রয়েছে, কারণ এটি অত্যন্ত বরকতময় ও ফজিলতপূর্ণ একটি ফল।
হাদিসে আজওয়া খেজুরের অনেক গুণ বর্ণিত হয়েছে। হজরত সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ভোরে সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন কোনো বিষ ও জাদুটোনা তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না’ (বুখারি : ৫৪৪৫)।
এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাওয়া হতে পারে দিনের বেলা বিষের প্রতিষেধক এবং জাদুটোনার সব ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্তির একটি নিরাপদ ও কার্যকর মাধ্যম। নবীজি (সা.) আজওয়া খেজুর ভীষণ পছন্দ করতেন। হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, ‘এটি জান্নাতের খেজুরের অন্তর্ভুক্ত এবং এর মধ্যে রয়েছে বিষের প্রতিষেধক গুণ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০৬৮)
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের মতেও আজওয়া খেজুরের শারীরিক উপকারিতা অপরিসীম। এটি প্রাকৃতিক শর্করা, ডায়েটারি ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামে ভরপুর। এটি নিয়মিত খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, রক্তে শর্করার মাত্রা সঠিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে এবং মানব শরীরকে দীর্ঘক্ষণ সতেজ ও শক্তি জোগাতে কাজ করে। তবে এত সব উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও ডায়াবেটিস কিংবা বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত খেজুর খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
আজওয়া খেজুরের উৎপত্তির সঙ্গে বিখ্যাত সাহাবি হজরত সালমান ফারসি (রা.)-এর দাসত্ব থেকে মুক্তির একটি ঘটনা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি মদিনার এক ইহুদির অধীনে ক্রীতদাস হিসেবে বন্দি ছিলেন। তার মুক্তির শর্ত হিসেবে সেই ইহুদি মালিক দাবি করে যে, সালমানকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ দিনার এবং ৩০ থেকে ৪০টি খেজুর গাছ রোপণ করতে হবে, যাতে সেগুলোতে নির্দিষ্ট সময়ে ফল ধরে।
তৎকালীন সময়ে স্বাভাবিক নিয়মে চারা রোপণের পর ফল আসতে কয়েক বছর সময় লাগত। এই কঠিন ও সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.) সালমান ফারসি (রা.)-এর সহায়তার জন্য নিজের পবিত্র হাতে খেজুরের চারাগুলো রোপণ করেন।
সেই চারাগুলো থেকে অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে গাছগুলো বড় হয়ে ফল দিতে শুরু করে। নবীজি (সা.)-এর নিজ হাতে রোপণ করা সেই বিশেষ জাতের খেজুরই পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ‘আজওয়া খেজুর’ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
আজওয়া খেজুর চেনার সহজ ও প্রধান উপায় হলো এর রং গাঢ় কালো হওয়া, এর গায়ে সূক্ষ্ম সাদা বা রুপালি রঙের রেখা বা দাগ থাকা এবং এর আকার মাঝারি বা ছোট হওয়া। এটি খুব বেশি শক্ত হয় না, বরং বেশ নরম প্রকৃতির হয়। আজওয়া খেজুর অতিরিক্ত মিষ্টি নয়, বরং এর প্রকৃত স্বাদ অত্যন্ত সুমিষ্ট হয়ে থাকে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, দোহা, কাতার
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে