বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে মন্দিরগুলোর জন্য বরাদ্দ করা চাল বিক্রির অর্থ থেকে মণ্ডপপ্রতি ১৯ হাজার ২০০ টাকা কেটে রাখার অভিযোগ উঠেছে ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্ট’-এর স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে। পূজা উদযাপন কমিটিগুলোর অভিযোগ, মণ্ডপপ্রতি ৮৮ হাজার ২০০ টাকার সমপরিমাণ বরাদ্দের বিপরীতে তাদের হাতে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬৯ হাজার টাকা। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসানের নির্দেশনা অনুযায়ী বরাদ্দপত্র সরাসরি মন্দির কমিটির হাতে দেওয়ার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ঘটনায় সংগঠনটির উপজেলা সভাপতি সুভাস দাস ও সাধারণ সম্পাদক আপন সুরের নাম এসেছে। সুভাস পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য এবং আপন সোনাইমুখী ওয়ার্ড যুবদলের কর্মী বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) উপজেলা পরিষদে বরাদ্দপত্র বিতরণের সময় তারা মন্দিরগুলোর বরাদ্দপত্র (ডিও) নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। পরে চাল বিক্রি করে মণ্ডপগুলোর প্রতিনিধিদের হাতে অর্থ তুলে দেন।
এর আগে গত শনিবার (১০ অক্টোবর) উপজেলার মাল্টিপারপাস হলরুমে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান নিজস্ব তহবিল থেকে মণ্ডপপ্রতি এক হাজার ৫০০ কেজি এবং সরকারি বরাদ্দ থেকে ৬০০ কেজি—মোট দুই হাজার ১০০ কেজি চাল দেওয়ার ঘোষণা দেন। প্রতিমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছিলেন, কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই বরাদ্দপত্র সরাসরি মন্দির কমিটির হাতে হস্তান্তর করতে হবে। এতে কমিটিগুলো বাজার যাচাই করে নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চাল বিক্রি করতে পারবে। এ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে উপজেলার ২৩টি মন্দিরের নামে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
নির্দেশনা অনুযায়ী বরাদ্দপত্র বিতরণের জন্য গত বুধবার মন্দির কমিটির নেতাদের উপজেলা পরিষদে আহ্বান করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজুর রহমান। তবে অভিযোগ উঠেছে, সেখানে উপস্থিত হয়ে কল্যাণ ফ্রন্টের সভাপতি সুভাস দাস ও সাধারণ সম্পাদক আপন সুর বরাদ্দপত্রগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। এ নিয়ে প্রতিবাদ জানালে শ্রী শ্রী মদনমোহন পূজামণ্ডপ কমিটির সভাপতি সুমিত কুমার দাসের সঙ্গে আপন সুরের বাগ্বিতণ্ডা হয়।
সুমিত কুমার দাস বলেন, ‘কল্যাণ ফ্রন্টের নেতারা চাল বিক্রি করে আমাদের হাতে মাত্র ৬৯ হাজার টাকা দিয়েছেন। বাজারে চালের দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকার বেশি হলেও তাঁরা ৩৩ টাকা দরে হিসাব করেছেন। চাল বিক্রির দায়িত্ব তাঁদের না থাকলেও প্রতিটি মন্দির থেকে বড় অঙ্কের টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। তবে ঝামেলা এড়াতে আমরা নিরিবিলি থাকতে চাই।’
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন শ্রী শ্রী কালাচাঁদ মন্দির পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি সঞ্জিব পাল। তিনি জানান, কল্যাণ ফ্রন্টের নেতারাই চালের দাম নির্ধারণ করে মণ্ডপগুলোর কাছে টাকা পৌঁছে দিয়েছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে নয়, বরং নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে কল্যাণ ফ্রন্টের উপজেলা সভাপতি সুভাস দাস বলেন, ‘অধিকাংশ মন্দির কর্তৃপক্ষ সরাসরি চাল নিতে রাজি না হওয়ায় আমরা চার-পাঁচজন পাইকারের সঙ্গে কথা বলে ৩৩ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করেছি। সে হিসাবে প্রতিটি মণ্ডপের ৬৯ হাজার ৩০০ টাকা পাওয়ার কথা, যা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা শুধু সহায়তার উদ্দেশ্যে দলীয়ভাবে এ কাজে যুক্ত হয়েছিলাম।’
উপজেলা বিএনপির সভাপতি গিয়াসউদ্দিন দিপেন বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সুবিধার্থে বরাদ্দপত্র সরাসরি মন্দির কমিটির হাতে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে সেই নির্দেশ যথাযথভাবে কার্যকর হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।’
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী তৌফিকুর রহমান বিপ্লব বলেন, রেজুলেশন অনুযায়ী ২৩টি মন্দিরের মূল কমিটির কাছেই বরাদ্দপত্র হস্তান্তরের কথা। অন্য কোনো সংগঠনের এ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার আইনি সুযোগ নেই।
মন্দির কমিটিগুলোর অভিযোগ ও কল্যাণ ফ্রন্টের সভাপতির বক্তব্যের মধ্যে বরাদ্দের অর্থ নিয়ে অসংগতি দেখা দিয়েছে। তবে বরাদ্দপত্র হস্তান্তর, চাল বিক্রির প্রকৃত দর এবং অর্থ বণ্টনে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তদন্তে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সময়ের আলো/জোই