গ্রাফিক : সময়ের আলো দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর মাধ্যমে পরিবারের নারীপ্রধানকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দারিদ্র্য মোকাবিলা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে উদ্যোগ ভালো হলেই যে নিশ্চিত সাফল্য মিলবে সেটা বলা যায় না। কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করাও জরুরি। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের নানা অসংগতি, নিয়োগ নিয়ে বিরোধ এবং কর্মকর্তাদের ওপর চাপের ঘটনা এই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। তাই কর্মসূচির লক্ষ্য পূরণ করতে হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এত বড় উদ্যোগ সফল করতে হলে শুরু থেকেই প্রকৃত উপকারভোগী বাছাই ও টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। তথ্য সংগ্রহকারী ও তদারককারী নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক চাপে কয়েকটি এলাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে বাধার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ আছে। এসব ঘটনা উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক চাপের কারণে এমন একটি কর্মসূচির কাজ বিঘ্নিত হবে সেটা কাম্য নয়। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতামত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে এত বড় কর্মসূচি সফল করা কঠিন। তাই প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরোধ কাম্য নয়। উভয়পক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
ফ্যামিলি কার্ডের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন করা। প্রকৃত দরিদ্র পরিবার বাদ পড়লে এবং তুলনামূলক সচ্ছল বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সুবিধা পেলে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। শুধু সফটওয়্যার বা ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করলেই এই সমস্যা দূর হবে না। তথ্য সংগ্রহে ভুল হলে কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে পক্ষপাত থাকলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাতেও বৈষম্য তৈরি হতে পারে। তাই পরিবারের আয়, সম্পদ, সদস্য সংখ্যা ও বিশেষ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে যোগ্যতা যাচাই করতে হবে। দরিদ্র, ভূমিহীন, প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা পরিবার এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
ফ্যামিলি কার্ড যেন কেবল টাকা বিতরণের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থাকে সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। মাসে আড়াই হাজার টাকা একটি দরিদ্র পরিবারের খাবার, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে কিছুটা সহায়তা করতে পারে। বাস্তবতা হচ্ছে এই টাকা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের চক্র ভাঙা অত্যন্ত কঠিন। নগদ সহায়তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন।
সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোও জরুরি। কোনো কারণে একই পরিবার যদি একাধিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পায় তা হলে অন্য কোনো যোগ্য পরিবার রাষ্ট্রের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। আবার তথ্যের অভাবে অনেক পরিবার হয়তো কোনো সহায়তাই পায় না। এ ধরনের সমস্যা দূর করতে একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির নিয়মিত স্বাধীন মূল্যায়ন হওয়া দরকার। এর মাধ্যমে দেখতে হবে যে, কারা সহায়তা পাচ্ছে, সহায়তার অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সরকারি সহায়তার মাধ্যমে উপকারভোগীদের জীবনমানে কী পরিবর্তন আসছে, সেটা জানাও জরুরি।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে কতগুলো কার্ড বিতরণ করা হলো সেই সংখ্যা দিয়ে এর সাফল্য মাপা যাবে না। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্য কমছে কি না, মানুষের জীবনমানের উন্নতি হচ্ছে কি না— সেটাই হবে সফলতার প্রধান মাপকাঠি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে