ছবি : সংগৃহীত বিয়ে ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। এ চুক্তির ভিত্তি হলো বর ও কনের সম্মতি এবং শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত পূরণ। কাউকে অনিচ্ছায় বিয়েতে বাধ্য করা ইসলামের সম্মতির নীতির পরিপন্থী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেউ বিয়েতে রাজি না থাকা সত্ত্বেও যদি তাকে জোর করে কাবিননামায় স্বাক্ষর করানো হয়, তাহলে কি বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যাবে? আবার কাবিননামায় স্বাক্ষর না থাকলে কি বিয়ে বৈধ হতে পারে?
এসব প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে বিয়েতে সম্মতির গুরুত্ব, ইজাব-কবুলের বিধান এবং কাবিননামার আইনগত ভূমিকা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সম্মতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়েতে বাধ্য করা উচিত নয়। এ বিষয়ে হাদিসে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বিধবা নারীকে তার মতামত নেওয়া ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না এবং কুমারী নারীকে তার অনুমতি নেওয়া ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কুমারী নারীর অনুমতি কীভাবে বোঝা যাবে?’ তিনি বললেন, ‘তার নীরবতা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৩৬)
তবে এই হাদিসে নীরবতাকে সম্মতির লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে। ভয়, চাপ, হুমকি কিংবা জবরদস্তির কারণে কেউ নীরব থাকলে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্মতি হিসেবে গণ্য করা যায় না। তাই বিয়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত সম্মতি ছিল কি না, তা বিবেচনা করা জরুরি।
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, বিয়ের অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো শরিয়তসম্মত ইজাব-কবুল। ইজাব অর্থ বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া এবং কবুল অর্থ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা। এ প্রক্রিয়া শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে সম্পন্ন হতে হয়। সাধারণভাবে বিয়ের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সময় প্রয়োজনীয় সাক্ষীর উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
কাবিননামা বিয়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তবে শুধু কাগজে স্বাক্ষর করাকেই সব পরিস্থিতিতে ইজাব-কবুলের বিকল্প মনে করা যায় না। কেউ যদি বিয়েতে সম্মতি না দিয়ে শুধু কাবিননামায় স্বাক্ষর করেন, তাহলে ওই স্বাক্ষর একাই বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। এ ক্ষেত্রে স্বাক্ষর করার পরিস্থিতি, বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণের বিষয়টি এবং শরিয়তের অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়েছিল কি না, তা যাচাই করতে হবে।
কাউকে ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে, প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কিংবা পারিবারিক চাপ প্রয়োগ করে কাবিননামায় স্বাক্ষর করানো হলে বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ, কাগজে স্বাক্ষর থাকা এবং স্বেচ্ছায় বিয়েতে সম্মতি দেওয়া এক বিষয় নয়।
কেউ স্পষ্টভাবে বিয়েতে অসম্মতি জানানোর পরও বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করলে, শুধু সেই স্বাক্ষরের ভিত্তিতে তাঁর সম্মতি ছিল বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। একই সঙ্গে, শুধু জবরদস্তির অভিযোগের ভিত্তিতে বিয়ে হয়েছে বা হয়নি—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো উচিত নয়। প্রকৃত ঘটনা, ইজাব-কবুলের ধরন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ বিবেচনা করে শরয়ি বিধান নির্ধারণ করতে হবে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুরো ঘটনা বিস্তারিতভাবে কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতিকে জানিয়ে শরয়ি পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আইনগত জটিলতা থাকলে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
কাবিননামায় স্বাক্ষর বিয়ের শরয়ি বৈধতার একমাত্র শর্ত নয়। শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে ইজাব-কবুল সম্পন্ন হলে শুধু কাবিননামায় স্বাক্ষর নেই—এ কারণে বিয়েকে অবৈধ বলা যায় না। অন্যদিকে, কাবিননামায় স্বাক্ষর থাকলেই যে বিয়ের সব শরয়ি শর্ত পূরণ হয়েছে, তা-ও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
অর্থাৎ, বিয়ের শরয়ি বৈধতা নির্ধারণে মূল বিবেচ্য হলো চুক্তিটি কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ হয়েছিল কি না। কাবিননামা সেই বিয়ের গুরুত্বপূর্ণ লিখিত প্রমাণ হলেও শরয়ি বৈধতার সব প্রশ্নের একমাত্র নির্ধারক নয়।
বাংলাদেশে মুসলিম বিয়ের নিবন্ধন ও কাবিননামার গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ভূমিকা রয়েছে। বিয়ের নিবন্ধন, স্বাক্ষরের সত্যতা কিংবা সম্মতি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট দলিলের পাশাপাশি ঘটনার পরিস্থিতি ও অন্যান্য প্রমাণও বিবেচনায় আসতে পারে।
কেউ জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ করলে তাঁর উচিত সংশ্লিষ্ট বার্তা, নথি, সাক্ষীর তথ্যসহ প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া। তবে শরয়ি বৈধতা ও বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে বিয়ের আইনগত অবস্থান দুটি পৃথক বিষয় হতে পারে। তাই উভয় দিকের প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে নেওয়া ভালো।
এ বিষয়ে ফাতহুল কাদির (৩/১৯০) ও আল-হিদায়া (২/৩০৬) গ্রন্থের সংশ্লিষ্ট আলোচনা পর্যালোচনা করা যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার চূড়ান্ত শরয়ি বিধান জানতে ঘটনার পূর্ণ বিবরণসহ যোগ্য মুফতির শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
বিয়েতে সম্মতি, ইজাব-কবুল ও শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত—প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কাবিননামায় স্বাক্ষর আছে কি নেই, তা দিয়ে সব ক্ষেত্রে বিয়ের বৈধতা নির্ধারণ করা যায় না। বিশেষ করে জোরপূর্বক স্বাক্ষরের অভিযোগ থাকলে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি। তাই এমন বিষয়ে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত না নিয়ে শরয়ি বিধানের জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতি এবং আইনগত প্রশ্নে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
সময়ের আলো/এসএসএকে