বেলুচিস্তানের তাফতান সীমান্ত দিয়ে ইরান থেকে ফিরে আসার পর পাকিস্তানি এক নাগরিককে হেঁটে যেতে দেখা যাচ্ছে। ছবি : গালফ নিউজ পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ক্রসিং দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এর ফলে প্রায় ২ হাজার ট্রাক আটকে পড়েছে।
একই সঙ্গে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সম্ভাব্য ঘাটতি এবং দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই স্থগিতাদেশের আওতায় রয়েছে গাবদ-রিমদান ও তাফতান সীমান্ত ক্রসিং। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের জন্য এই পথগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবেলা, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উন্নত করার লক্ষ্যে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
বেলুচিস্তান সরকার রোববার জানিয়েছে, সীমান্ত ক্রসিংগুলো যত দ্রুত সম্ভব পুনরায় চালু করতে পাকিস্তান ও ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
কেন সীমান্ত বন্ধ করা হয়েছে?
বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রীর গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা শহিদ রিন্দ বলেছেন, নিরাপত্তা জোরদার, চোরাচালান বন্ধ এবং আরও কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সাময়িকভাবে সীমান্ত বন্ধ করা প্রয়োজন হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সীমান্ত বন্ধের কারণসংক্রান্ত বিভিন্ন গুজব তিনি নাকচ করে দিয়েছেন। পাশাপাশি জনসাধারণকে যাচাই করা তথ্যের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়েছেন।
রিন্দ বলেন, দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, “বর্তমান অগ্রগতির পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান-ইরান সীমান্ত শিগগিরই পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, সীমান্ত পরিচালনা উন্নত করা, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।
তার মতে, উন্নত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ব্যবসায়ীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্তবর্তী জনপদগুলোর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেও সহায়তা করবে।
ইরান কী বলছে?
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ইরনার (IRNA) বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, কারিগরি সমস্যার কারণে এই বিঘ্ন ঘটেছে।
তিনি বলেন, স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে দুই দেশ পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করছে।
আটকে পড়েছে প্রায় ২ হাজার ট্রাক
সীমান্তে বাণিজ্যিক কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। ডন অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলপিজি, চাল, তাজা ফলসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রাক সীমান্তের উভয় পাশে আটকে পড়েছে।
কোয়েটা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি জানিয়েছে, পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে চলাচলকারী প্রায় ২ হাজার ট্রাক এই স্থগিতাদেশের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চেম্বারটি সতর্ক করে বলেছে, দীর্ঘ সময় ধরে সীমান্ত বন্ধ থাকলে ব্যবসায়ী ও আন্তসীমান্ত বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে জড়িত ব্যবসায়ীদের নতুন আমদানি ও রপ্তানি আদেশ স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে চেম্বারটি।
পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুক্রবার একটি স্মারকলিপি জারি করে ৩ অক্টোবরের আগের একটি আদেশ প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে নির্ধারিত সীমান্ত ক্রসিংগুলো দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়েছে।
তবে ইরানের সংবাদ সংস্থা ওয়ানা জানিয়েছে, রিমদান-গাবদ সীমান্ত দিয়ে যাত্রী চলাচল এখনো চালু রয়েছে বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এলপিজির সরবরাহ নিয়ে
সীমান্ত বন্ধের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হলো পাকিস্তানে এলপিজির সরবরাহে সম্ভাব্য প্রভাব।
গাবদ-রিমদান সীমান্ত ক্রসিংটি জ্বালানি আমদানির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পথ দিয়ে প্রতিদিন ৪ হাজার টনেরও বেশি এলপিজি পাকিস্তানে প্রবেশ করছিল।
ব্যবসায়ী ও জ্বালানি খাতের প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেন, সীমান্ত দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে করাচি এবং পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলে এলপিজির সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে আমদানি কমে যাওয়ার কারণে খোলাবাজারে এলপিজির দামও বেড়ে যেতে পারে।
এদিকে, বেলুচিস্তানে নিরাপত্তাজনিত সমস্যার কারণে তাফতান রুটে আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, সীমান্তে বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকলে বাণিজ্য থেকে আয় কমে যাবে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং সীমান্তকেন্দ্রিক ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।
চাপের মুখে পাকিস্তান-ইরান বাণিজ্য সম্পর্ক
ইসলামাবাদ ও তেহরান যখন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানো এবং সীমান্ত যোগাযোগ উন্নত করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই এই স্থগিতাদেশের ঘটনা ঘটল।
মার্চ মাস থেকে দুই দেশ শুল্ক প্রক্রিয়া সহজ করা, পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা উন্নত করা এবং বাণিজ্যিক যানবাহনের চলাচল সহজ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
আগস্টে ইরানের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী মোহাম্মদ আতাবাকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তান সফর করে। পাকিস্তান-ইরান যৌথ বাণিজ্য কমিটির দশম অধিবেশনে অংশ নেওয়াই ছিল এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গেও বৈঠক করে। উভয় পক্ষ সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করা, শুল্ক প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় আনা এবং সীমান্ত ক্রসিংগুলোতে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম চালুর লক্ষ্যে কাজ করে বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়।
তবে ব্যবসায়ীদের মতে, দুর্বল সড়ক অবকাঠামো এবং বারবার নিরাপত্তাজনিত ঘটনার কারণে সীমান্তের বেশ কয়েকটি পথে এখনো বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে।
এর আগে গওয়াদর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি জিয়ান্দ হুট বলেছিলেন, পর্যাপ্ত সড়ক না থাকা এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনার কারণে পাঞ্জগুর ও মান্দ-রাদিগ সীমান্তপথে বাণিজ্য কার্যত বন্ধ রয়েছে।
কবে আবার বাণিজ্য শুরু হবে?
পাকিস্তান ও ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তে বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তটি সাময়িক। তবে বাণিজ্য পুনরায় চালুর জন্য এখনো নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
বেলুচিস্তান সরকার বলেছে, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে চলছে। বাকি প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান হলে সীমান্ত ক্রসিংগুলো শিগগিরই আবার চালু করা হতে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ