সঠিকভাবে মতবিরোধ সামলাতে পারলে সম্পর্ক আরও গভীর ও দৃঢ় হয়। ছবি : সংগৃহীত বন্ধুত্ব মানেই সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। কাছের বন্ধুদের মধ্যেও মতপার্থক্য, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা অভিমান তৈরি হতে পারে। কখনো সামান্য কোনো ঘটনা থেকে মনোমালিন্য শুরু হয়, আবার কখনো জমে থাকা ক্ষোভ বড় দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। তবে, সঠিকভাবে মতবিরোধ সামলাতে পারলে তা বন্ধুত্ব নষ্ট করার বদলে সম্পর্ককে আরও গভীর ও দৃঢ় করতে পারে।
‘দ্য আর্ট অব ফাইটিং’ বইয়ের লেখক প্রিয়া পার্কারের মতে, দ্বন্দ্বকে আমরা সাধারণত নেতিবাচকভাবে দেখি। আমাদের ধারণা, মতবিরোধ মানুষকে পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অথচ গঠনমূলক দ্বন্দ্ব সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে পারে।
পার্কারের মতে, মতবিরোধ এড়িয়ে চলার প্রবণতা একাকিত্ব বাড়াতে পারে। কারণ, এতে অনেক সমস্যা অমীমাংসিত থেকে যায়, যা পরবর্তী সময়ে ক্ষোভ, অভিমান কিংবা বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার কারণ হতে পারে। অন্যদিকে, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য সামলাতে পারলে এমন বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যেখানে প্রত্যেকে নিজের মতামত ও অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ পান। তবে, এর জন্য দ্বন্দ্ব সামলানোর সঠিক কৌশল জানা প্রয়োজন।
কোন বিষয় নিয়ে কথা বলবেন, তা বুঝে নিন
প্রতিটি মতবিরোধ নিয়ে তর্কে জড়ানো প্রয়োজন নেই। তাই বন্ধুর সঙ্গে কোনো বিষয়ে কথা বলার আগে ভেবে দেখুন, বিষয়টি আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন এটি আপনাকে বিরক্ত করছে। নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন- আপনি কি বন্ধুত্বটি ধরে রাখতে চান? সমস্যাটি কি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব, নাকি বিষয়টি উপেক্ষা করাই ভালো?
প্রিয়া পার্কারের মতে, গঠনমূলকভাবে মতবিরোধ সামলাতে হলে কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন, তা বেছে নেওয়া জরুরি। কারণ, সব বিষয়ে লড়াই করা কিংবা প্রতিটি মতপার্থক্যের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
ছোটখাটো অভিমান জমতে দেবেন না
ছোট সমস্যা সময়মতো সমাধান না করলে, তা বড় আকার ধারণ করতে পারে। ধরুন, বন্ধুর সঙ্গে কোথাও দেখা করা বা ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা সবসময় আপনাকেই করতে হয়। একসময় আপনার মনে হতে পারে, বন্ধুটি হয়ত এই বন্ধুত্বকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিজের মনে নেতিবাচক ধারণা জমতে না দিয়ে বন্ধুর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা ভালো। পার্কার মনে করেন, ছোট ছোট ঘটনা থেকে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ধারণা একসময় দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা বললে সেই ধারণা বদলানোর সুযোগ তৈরি হয়।
বন্ধুকে অভিযোগের সুরে কিছু না বলে সহজভাবে বলতে পারেন, ‘তুমি যদি কখনো নিজে থেকে আমাকে কোথাও যাওয়ার জন্য ডাকতে, তাহলে আমার খুব ভালো লাগত।’ এতে নিজের প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়, কিন্তু বন্ধুকে সরাসরি দোষারোপ করা হয় না।
সমস্যাটি গুরুতর মনে হলে সেটি এড়িয়ে না গিয়ে বন্ধুকে জানান, বিষয়টি আপনাকে ভাবাচ্ছে। বন্ধুত্বকে গুরুত্ব দেন বলেই সমস্যাটি বড় হওয়ার আগেই সমাধান করতে চান- এ কথা বোঝাতে পারলে আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোতে পারে।
আলোচনার আগে শান্ত থাকার চেষ্টা করুন
মতবিরোধের সময় আবেগের বশে অনেকেই এমন কথা বলে ফেলেন, যা পরে অনুশোচনার কারণ হয়। তাই কোনো সমস্যা নিয়ে আলোচনায় বসার আগে নিজেকে শান্ত করা জরুরি।
প্রিয়া পার্কার দ্বন্দ্ব সামলানোর আগে গভীর শ্বাস নেওয়া এবং শরীরের চাপ কমাতে হাত ঝেড়ে শিথিল হওয়ার মতো কৌশল অনুসরণ করেন। তার মতে, দ্বন্দ্বের সঙ্গে শারীরিক প্রতিক্রিয়াও জড়িত। উত্তেজিত হলে কারও শরীর কাঁপতে পারে, অস্থিরতা দেখা দিতে পারে কিংবা গরম লাগতে পারে।
এ অবস্থায় কিছুক্ষণ বিরতি নেওয়া, ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া এবং নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করা সহায়ক হতে পারে। এতে আলোচনায় মনোযোগ ধরে রাখা এবং আবেগের পরিবর্তে যুক্তি দিয়ে কথা বলা সহজ হয়।
অপমান বা দোষারোপ নয়, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করুন
মতবিরোধ হলেই বন্ধুত্বে বড় কোনো সমস্যা রয়েছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। কোনো বিষয়ে কষ্ট পেলে বন্ধুকে অপমান করা কিংবা তার আচরণকে সরাসরি বিচার করার পরিবর্তে কোন বিষয়টি আপনাকে আঘাত করেছে, তা স্পষ্ট করে বলুন।
একই সঙ্গে বন্ধুর বক্তব্য শোনার সুযোগ দিন। আপনার দৃষ্টিভঙ্গিই যে একমাত্র সঠিক, এমনটা ধরে না নিয়ে অন্য ব্যক্তির অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাও বোঝার চেষ্টা করুন।
পার্কারের মতে, কোনো বন্ধু আপনার কাছে অভিযোগ বা উদ্বেগের কথা জানালে সঙ্গে সঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যস্ত হয়ে পড়ার প্রয়োজন নেই। বরং বিষয়টিকে বন্ধুত্বের প্রতি তার গুরুত্বের প্রকাশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
কেউ সম্পর্কের কোনো সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন মানেই তিনি বন্ধুত্ব ভাঙতে চান, এমন নয়। বরং সম্পর্কটি ভালো রাখতে চান বলেই হয়ত সমস্যাটির সমাধান খুঁজছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখলে মতবিরোধের সময় পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া অটুট রাখা সহজ হয়।
সূত্র : রিয়েল সিম্পল
সময়ের আলো/মহু