জীবনপথে চলার অন্যতম বিশ্বস্ত সঙ্গী হলো বন্ধু। এই সুন্দর বন্ধনকে উদযাপন করতে সারা বিশ্বে পালিত হয় বন্ধু দিবস। বন্ধুত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে নির্মিত হয় সিনেমা, রচিত হয় গান কিংবা কবিতা।
১৯৩০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হলমার্ক কার্ডসের প্রতিষ্ঠাতা জয়েস হল প্রথম বন্ধুদের সম্মান জানাতে বিশেষ একটি দিনের ধারণা সামনে আনেন। বেশ কিছু বছর পর, ১৯৫৮ সালে প্যারাগুয়ের চিকিৎসক ড. রামোন আর্তেমিও ব্রাচো ‘ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেড’ নামে এক মানবিক ভাবনার উন্মেষ ঘটান। বৈশ্বিক শান্তি, ভ্রাতৃত্ব এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি জোরদার করাই ছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য। পরবর্তীতে ২০১১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আগস্ট মাসের প্রথম রোববার বন্ধু দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে।
বন্ধু দিবসে এমন ১০ টি সিনেমা সম্পর্কে জেনে নিন, যা দিনটি উদযাপন উপলক্ষ্যে প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে দেখতে পারেন।
'দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন' (১৯৯৪)
বন্ধুত্ব, আশা এবং মুক্তির অসাধারণ এক গল্প হলো দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন। নিরপরাধ অ্যান্ডি ডুফ্রেস জেলে বন্দি হওয়ার পর রেডের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও অ্যান্ডির বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য এবং বন্ধুর প্রতি আস্থা তার জীবনকে নতুন পথে এগিয়ে নেয়।
এই সিনেমায় বন্ধুত্ব মানসিক ভরসা, বেঁচে থাকার শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। আশা, বিশ্বাস এবং একে অপরের পাশে থাকার গুরুত্বকে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছে সিনেমাটি।
'থ্রি ইডিয়টস' (২০০৯)
রাজকুমার হিরানি পরিচালিত থ্রি ইডিয়টস ৩ বন্ধুর গল্পের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা, স্বপ্ন এবং জীবনের প্রকৃত সাফল্যের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। র্যাঞ্চো, ফারহান ও রাজুর বন্ধুত্ব সিনেমাটিকে হাস্যরস, আবেগ এবং অনুপ্রেরণার মিশেলে দারুণভাবে প্রকাশ করেছে।
প্রকৃত বন্ধু যে শুধু আনন্দের মুহূর্তেই নয়, সংকটের সময়ও পাশে থাকে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহস জোগায় তা শেখায় এই সিনেমা। একইসঙ্গে বন্ধুত্বের শক্তি ও জীবনের মূল্যবোধকে হৃদয়স্পর্শীভাবে তুলে ধরেছে সিনেমাটি।
'স্ট্যান্ড বাই মি' (১৯৮৬)
১৯৮৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত স্ট্যান্ড বাই মি শৈশবের বন্ধুত্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি স্মরণীয় সিনেমা। ৪ কিশোর একটি মৃতদেহ খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে, তারপর সেই পথচলাতেই তারা নিজেদের, একে অপরকে এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে নতুনভাবে চিনতে শেখে।
সিনেমাটি শৈশবের নির্মল বন্ধুত্ব, বেড়ে ওঠা এবং স্মৃতির গুরুত্বকে গভীরভাবে তুলে ধরে। সত্যিকারের বন্ধুত্ব যে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি, তা নতুন করে মনে করিয়ে দেয় এই সিনেমা।
'জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা' (২০১১)
৩ বন্ধুর বহুদিনের দূরত্ব ঘুচিয়ে একসঙ্গে স্পেনে রোড ট্রিপে বের হওয়ার গল্প নিয়ে নির্মিত জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা। এই ভ্রমণের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভয় কাটিয়ে উঠে, সম্পর্কের জটিলতা দূর করে এবং জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পায়।
সিনেমাটি একইসঙ্গে বন্ধুত্বের, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এবং ক্ষমার মাহাত্ম্যের। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করা এবং প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ককে মূল্য দেওয়ার বার্তা দেয় এই চলচ্চিত্র।
টয় স্টোরি (১৯৯৫–২০২৬)
শেরিফ উডি প্রাইড ও বাজ লাইটইয়ার অ্যানিমেশন জগতের অন্যতম জনপ্রিয় বন্ধু জুটি। তাদের বন্ধুত্বকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে বিখ্যাত গান ‘ইউ গট এ ফ্রেন্ড ইন মি’। ৫টি টয় স্টোরি চলচ্চিত্রে দেখা যায়, কীভাবে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে একে অপরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে ওঠে, একসঙ্গে নানা উদ্ধার অভিযান চালায় এবং তাদের মালিক অ্যান্ডির বড় হয়ে ওঠার বাস্তবতাও মেনে নেয়।
এই সিরিজটি বন্ধুত্ব, বিশ্বস্ততা ও আত্মত্যাগের সুন্দর বার্তা দেয়। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখার জন্য এটি দারুণ একটি সিরিজ।
শ্রেক (২০০১)
ড্রিমওয়ার্কসের অস্কারজয়ী এই অ্যানিমেশন ছবিতে শ্রেক নামে এক নিঃসঙ্গ দানবের জীবনে আসে প্রাণবন্ত ডংকি। তাদের বন্ধুত্ব দেখায়, সত্যিকারের বন্ধু কখনও বাহ্যিক রূপ দেখে না, মানুষের মনের সৌন্দর্যই দেখে। ডংকির নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও ধৈর্য শ্রেককে বদলে দেয়। শিশু ও বড় সব বয়সের দর্শকের জন্য এটি আনন্দদায়ক ও শিক্ষণীয় সিনেমা।
গার্ডিয়ানস অব দ্য গ্যালাক্সি (২০১৪)
জেমস গান পরিচালিত এই সাই-ফাই অ্যাডভেঞ্চার সিনেমাটি ‘ফাউন্ড ফ্যামিলি’ বা বন্ধুদের নিয়ে গড়ে ওঠা পরিবারের গল্প। পিটার কুইল ও তার সঙ্গীরা নানা বিপদের মধ্য দিয়ে একে অপরের ওপর ভরসা করতে শেখে। তাদের বিখ্যাত সংলাপ ‘We Are Groot’ এ সিনেমায় বন্ধুত্বের শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। ছবিটি জানায়, সত্যিকারের বন্ধুত্ব ভেঙে পড়া মানুষকেও নতুনভাবে বাঁচতে শেখায়।
দ্য আপসাইড (২০১৭)
এই সিনেমায় পঙ্গু ধনকুবের ফিলিপ ও তার কেয়ারগিভার ডেলের বন্ধুত্বের গল্প বলা হয়েছে। ভিন্ন আর্থ-সামাজিক পরিবেশ থেকে এলেও তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর সম্পর্ক। ডেল ফিলিপের জীবনে আনন্দ ফিরিয়ে আনে ও ফিলিপ ডেলকে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ দেয়। ছবিটি অনুভব করায়, সত্যিকারের বন্ধুত্ব সব সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে যেতে পারে।
গ্রিন বুক (২০১৮)
১৯৬২ সালের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই অস্কারজয়ী সিনেমায় একজন ইতালীয়-আমেরিকান ড্রাইভার ও একজন কৃষ্ণাঙ্গ পিয়ানোবাদকের বন্ধুত্বের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। শুরুর দিকে তাদের মধ্যে বর্ণবাদ ও সামাজিক বিভেদ থাকলেও, দীর্ঘ সফরের পথে তারা একে অপরকে বুঝতে শেখে। সিনেমাটি বন্ধুর জন্য সব ধরনের সামাজিক বাধা অতিক্রম করতে শেখায়। ইতিহাস ও বাস্তবধর্মী গল্প পছন্দ করেন, এমন দর্শকদের জন্য এটি উপযুক্ত সিনেমা।
স্পাইডারম্যান : ব্র্যান্ড নিউ ডে (২০২৬)
ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্রেটন পরিচালিত এই মার্ভেল সিনেমায় টম হল্যান্ড পিটার পার্কারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ডক্টর স্ট্রেঞ্জের জাদুর কারণে এমজে ও নেড তাকে ভুলে গেলেও, পিটার একাই নিজের লড়াই চালিয়ে যায়।
সিনেমাটি ত্যাগ, স্মৃতি ও বন্ধুত্বের আবেগময় গল্প তুলে ধরে। দূরে থেকেও যে প্রিয়জনকে রক্ষা করা যায়, সেই শিক্ষা দেয় এ সিনেমা।
সময়ের আলো/মহু