ডা. নির্ণয় পাল
দীর্ঘস্থায়ী কাশি শুধু সাধারণ সংক্রমণ নয়, অ্যালার্জি, অ্যাজমা, অ্যাসিড রিফ্লাক্স এমনকি যক্ষ্মার মতো রোগেরও লক্ষণ হতে পারে। ছবি : সংগৃহীত কাশি শ্বাসতন্ত্রকে ধুলাবালি, জীবাণু ও জমে থাকা কফ থেকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। সর্দি-জ্বর বা ভাইরাসের সংক্রমণের পর কয়েক দিন কাশি থাকাও স্বাভাবিক। কিন্তু কাশি যখন কয়েক সপ্তাহ ধরে স্থায়ী হয়, বারবার ফিরে আসে কিংবা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তখন এর কারণ খুঁজে দেখা জরুরি। কারণ দীর্ঘস্থায়ী কাশি শুধু সাধারণ সংক্রমণ নয়, অ্যালার্জি, অ্যাজমা, অ্যাসিড রিফ্লাক্স এমনকি যক্ষ্মার মতো রোগেরও লক্ষণ হতে পারে।
সংক্রমণের পরও কেন থাকে কাশি?
শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসজনিত সংক্রমণ সেরে যাওয়ার পরও অনেকের কাশি কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। সংক্রমণের কারণে শ্বাসনালিতে প্রদাহ ও অতিসংবেদনশীলতা তৈরি হলে সামান্য ধুলাবালি, ঠান্ডা বাতাস কিংবা তীব্র গন্ধেও কাশি শুরু হতে পারে। একে সংক্রমণ-পরবর্তী কাশি বলা হয়। তবে দীর্ঘদিন কাশি থাকলেই যে তা সংক্রমণের প্রভাব, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
অ্যালার্জিও দীর্ঘস্থায়ী কাশির অন্যতম কারণ। ঘরের ধুলাবালি, পরাগরেণু, ছত্রাক, পশুর লোম কিংবা পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের সংস্পর্শে এ সমস্যা বাড়তে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে রাতে বা ভোরের দিকে কাশি বেশি হয়। আবার অ্যাজমার রোগীদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট কিংবা বুক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়াও শুধু শুকনো কাশি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ব্যায়াম, ঠান্ডা বাতাস বা ধুলাবালির সংস্পর্শে কাশি বাড়লে অ্যাজমার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হয়।
ফুসফুস ছাড়াও থাকতে পারে কারণ
দীর্ঘস্থায়ী কাশির কারণ সবসময় ফুসফুসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাকস্থলির অ্যাসিড খাদ্যনালিতে উঠে এলে গলা ও শ্বাসনালিতে জ্বালা সৃষ্টি হতে পারে। এ সমস্যাকে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স বলা হয়। এতে খাবার খাওয়ার পর কিংবা রাতে শুয়ে পড়লে কাশি বাড়তে পারে। কারও টক ঢেকুর, বুক জ্বালাপোড়া বা গলায় অস্বস্তি থাকে, আবার কারও ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ ছাড়াও কাশি দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া ধূমপান, বায়ুদূষণ এবং দীর্ঘসময় ধুলাবালিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার কারণে শ্বাসনালিতে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালা ও প্রদাহ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ধূমপানের অভ্যাস থাকলে ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস বা দীর্ঘস্থায়ী অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজের (সিওপিডি) মতো রোগের কারণেও কাশি হতে পারে। কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশির জন্য দায়ী হতে পারে। তাই কাশির প্রকৃতি, রোগীর পূর্ববর্তী অসুস্থতা এবং ওষুধ ব্যবহারের ইতিহাস জানা গুরুত্বপূর্ণ।
যক্ষ্মার লক্ষণ অবহেলা নয়
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিনের কাশির ক্ষেত্রে যক্ষ্মার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কাশির সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, রাতে অতিরিক্ত ঘাম, ক্ষুধামন্দা, ওজন কমে যাওয়া কিংবা দুর্বলতা থাকলে সতর্ক হতে হবে। কফের সঙ্গে রক্ত আসাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।
সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের কাশি আট সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে তাকে দীর্ঘস্থায়ী কাশি বলা হয়। তবে কাশি এত দিন চলার অপেক্ষা করা ঠিক নয়। শিশুদের ক্ষেত্রে চার সপ্তাহের বেশি কাশি থাকলে বিশেষভাবে মূল্যায়ন প্রয়োজন। কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা বা রক্ত ওঠার মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। তীব্র শ্বাসকষ্ট বা ঠোঁট নীল হয়ে গেলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
চিকিৎসা হবে কারণ অনুযায়ী
দীর্ঘদিন কাশি হলে নিজের মতো অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড কিংবা কাশির সিরাপ খাওয়া উচিত নয়। সব কাশির চিকিৎসা এক নয়। অ্যালার্জি, অ্যাজমা, রিফ্লাক্স, সংক্রমণ কিংবা অন্য কোনো রোগের কারণে কাশি হলে চিকিৎসাপদ্ধতিও আলাদা হবে।
চিকিৎসককে জানাতে হবে কাশি কত দিন ধরে হচ্ছে, শুকনো নাকি কফযুক্ত, রাতে বাড়ে কি না, সঙ্গে জ্বর বা শ্বাসকষ্ট আছে কি না এবং ধূমপানের অভ্যাস রয়েছে কি না। প্রয়োজন অনুযায়ী বুকের এক্স-রে, কফ পরীক্ষা, ফুসফুসের কার্যকারিতা পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে।
কাশি সাময়িকভাবে কমে গেলেই যে সমস্যার সমাধান হয়েছে, তা নয়। দীর্ঘস্থায়ী কাশির প্রকৃত কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসা নিলে অনেক ক্ষেত্রেই জটিলতা এড়ানো সম্ভব। তাই কাশিকে অবহেলা না করে উপসর্গের ধরন বুঝে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লেখক : মেডিসিন ও নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি/এমকে