প্রশ্ন জাগে— আমরা কি ধর্মকে জানার চেষ্টা করছি, নাকি ধর্মকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছি? গ্রাফিক : সময়ের আলোধর্ম মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথ। অথচ ধর্মের নামেই যখন সমাজে উত্তেজনা ছড়ায়, ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয় এবং যুক্তির পরিবর্তে আবেগ প্রাধান্য পায়, তখন প্রশ্ন জাগে— আমরা কি ধর্মকে জানার চেষ্টা করছি, নাকি ধর্মকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছি?
ইসলাম যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সংযম ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়, তার সঙ্গে অজ্ঞতাপ্রসূত বিতর্কের এই বৈপরীত্য গভীরভাবে ভাবার দাবি রাখে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় বিষয়ে মতামত, পাল্টা মতামত ও বিতর্কের অভাব নেই। কিন্তু সব আলোচনাই জ্ঞানচর্চা নয়। অনেক ক্ষেত্রে মূল বক্তব্য না বুঝেই মন্তব্য করা, অসম্পূর্ণ তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, আলেমদের বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ প্রচার করা কিংবা অন্যের বিশ্বাসকে অপমান করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রবণতা দেখা যায়। এতে সত্য অনুসন্ধানের চেয়ে দলীয় আনুগত্য ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বড় হয়ে ওঠে। অথচ ধর্মীয় জ্ঞানের উদ্দেশ্য মানুষকে ন্যায়পরায়ণ, দায়িত্বশীল ও বিনয়ী করে তোলা, বিতর্কে জয়ী হয়ে অন্যকে হেয় করা নয়।
ইসলামের প্রথম নির্দেশই ছিল জ্ঞান অর্জনের প্রতি আহ্বান। পবিত্র কুরআনের সুরা আলাকের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে, ‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন(সুরা আলাক : ১)। এই নির্দেশের তাৎপর্য কেবল ধর্মীয় পাঠে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সৃষ্টিজগৎ, জীবন ও সত্যকে জানার জন্য মানুষের চিন্তা ও অনুধাবনকে গুরুত্ব দেয়। কুরআন আরও প্রশ্ন করেছে, ‘যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান’ (সুরা আয-যুমার : ৯)? জ্ঞানের মর্যাদা সম্পর্কে এর চেয়ে স্পষ্ট বার্তা আর কী হতে পারে? সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় ধর্মীয় বক্তব্য শুনতে আগ্রহী হলেও তার উৎস, প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা যাচাই করতে আগ্রহী হই না।
কোন আয়াত কোন পরিস্থিতিতে নাজিল হয়েছে, কোন হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা কী, কিংবা কোন বিষয়ে ইসলামি চিন্তাবিদদের মতপার্থক্যের কারণ কী— এসব জানার চেয়ে কে কাকে পরাস্ত করল, সেটিই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। অথচ না জেনে কথা বলা যেমন বিভ্রান্তি বাড়ায়, তেমনি অসম্পূর্ণ জ্ঞান নিয়ে অন্যের বিশ্বাস ও চরিত্র বিচার করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৩৬)। এই নির্দেশ ধর্মীয় আলোচনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য প্রচার এবং ব্যক্তিগত আচরণ সব ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক। কোনো তথ্য যাচাই না করে শেয়ার করা কিংবা কারও বক্তব্যের একটি অংশ দিয়ে তাকে বিচার করা কেবল ভুল বোঝাবুঝিই তৈরি করে না; সামাজিক বিভাজনও বাড়াতে পারে।
ইসলাম মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা ও সুন্দর আচরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার রবের পথে আহ্বান করো হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে’ (সুরা নাহল : ১২৫)। অর্থাৎ সত্যের পক্ষে কথা বলতে হবে, তবে সেই কথার ভাষা ও পদ্ধতিও হতে হবে শালীন। কাউকে অপমান করে, বিদ্রুপ করে কিংবা উত্তেজিত জনতাকে উসকে দিয়ে ধর্মীয় সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না। যুক্তিপূর্ণ আলোচনা ও অশালীন বাক্যবিনিময়ের পার্থক্য বুঝতে না পারলে ধর্মীয় সংলাপও সংঘাতের রূপ নেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৭)। এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কথা বলার স্বাধীনতার সঙ্গে কথার দায়ও জড়িত। বিশেষত ধর্মীয় বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার আগে তার সত্যতা, প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।
ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায় অনীহার পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। প্রথমত, পাঠাভ্যাসের দুর্বলতা। মূল ধর্মীয় গ্রন্থ ও নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা পড়ার পরিবর্তে অনেকে ছোট ভিডিও, পোস্ট কিংবা অন্যের মুখে শোনা বক্তব্যের ওপর নির্ভর করেন। দ্বিতীয়ত, নিজের মতের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি। কোনো বক্তব্য নিজের পূর্বধারণার সঙ্গে মিলে গেলে তা যাচাই ছাড়াই গ্রহণ করা হয়; বিপরীত বক্তব্য সামনে এলে যুক্তি দিয়ে বোঝার বদলে প্রত্যাখ্যান করা হয়।
তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াভিত্তিক সংস্কৃতি। সেখানে গভীর অধ্যয়নের চেয়ে তীক্ষ্ণ মন্তব্য দ্রুত মনোযোগ পেতে পারে। ফলে জ্ঞান অর্জনের ধৈর্য ও আত্মসমালোচনার মানসিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ধর্মীয় মতপার্থক্য থাকলেই তা নেতিবাচক নয়। ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ ও ব্যাখ্যাগত আলোচনা ছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মতভেদ যেন বিদ্বেষ, অপমান কিংবা অন্যায় আচরণের কারণ না হয়। নিজের মতকে সঠিক মনে করা আর নিজের মতকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেওয়া এক বিষয় নয়। বিনয়ী মানুষ প্রয়োজন হলে নিজের ভুল সংশোধন করেন; আত্মম্ভরী মানুষ ভুল প্রমাণিত হলেও নিজের অবস্থান আঁকড়ে থাকেন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র ও গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিবারে শিশু-কিশোরদের প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে হবে, যেন ধর্মীয় বিষয়ে কৌতূহলকে অবাধ্যতা মনে করা না হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি তথ্য যাচাই, যুক্তিবোধ, পাঠাভ্যাস ও ভিন্নমতকে সম্মান করার শিক্ষা দিতে হবে। মসজিদ ও ধর্মীয় আলোচনায় কেবল মতভেদ তুলে ধরার পরিবর্তে নৈতিকতা, মানবিকতা, পারিবারিক দায়িত্ব, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। ধর্মীয় বক্তব্য শেয়ার করার আগে মূল উৎস যাচাই করা, অসম্পূর্ণ উদ্ধৃতি এড়িয়ে চলা এবং ভুল তথ্য ছড়ালে তা সংশোধন করা জরুরি। কোনো বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞান না থাকলে স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং এটি বুদ্ধিবৃত্তিক সততা। একইভাবে জটিল ধর্মীয় বিষয়ে যোগ্য ও নির্ভরযোগ্য আলেমের ব্যাখ্যা নেওয়া এবং মতভেদের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ বিবেচনা করা উচিত। সবচেয়ে বড় কথা, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চাকে আত্মশুদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদতের পাশাপাশি নিজের আচরণে সততা, সহনশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের প্রতি সম্মান কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেই হিসাবও জরুরি। ধর্মীয় পরিচয়ের জোরে অন্যকে ছোট করা সহজ; নিজের অহংকার নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন। অথচ প্রকৃত নৈতিক উন্নতির পরীক্ষা সেখানেই।
ধর্মীয় বিতর্কে কে জিতল, তা দিয়ে সমাজের জ্ঞান বা নৈতিকতার মান নির্ধারিত হয় না। বরং মানুষ কতটা সত্যনিষ্ঠ হলো, কতটা ভুল থেকে ফিরে এলো এবং মতপার্থক্যের মধ্যেও কতটা ন্যায়পরায়ণ থাকল, সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম জ্ঞান অর্জন, প্রজ্ঞার সঙ্গে কথা বলা এবং উত্তম চরিত্র গঠনের শিক্ষা দেয়। তাই ধর্মকে উত্তেজনার হাতিয়ার না বানিয়ে জ্ঞান, বিবেক ও আত্মশুদ্ধির পথ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ ধর্মের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হওয়া নয়, ধর্মের শিক্ষা নিজের জীবনে ধারণ করাই বিশ্বাসের প্রকৃত সৌন্দর্য।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি/এমকে