দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে কেন পতিতালয়ের মাটি ব্যবহার করা হয়?

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

শারদীয় দুর্গাপূজা মানেই ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ, আলোকসজ্জা ও মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতিবছর দুর্গাপূজায় প্রতিমা

2026-10-19T14:42:35+00:00
2026-10-19T14:46:10+00:00
 
  সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬,
৩ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ফিচার
দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে কেন পতিতালয়ের মাটি ব্যবহার করা হয়?
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪২ পিএম  আপডেট: ১৯.১০.২০২৬ ২:৪৬ পিএম
দুর্গাপ্রতিমা ও তার সন্তানেরা। ছবি : সময়ের আলো
শারদীয় দুর্গাপূজা মানেই ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ, আলোকসজ্জা ও মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতিবছর দুর্গাপূজায় প্রতিমা তৈরির উপকরণ হিসেবে গঙ্গার পলিমাটির পাশাপাশি পতিতালয়ের মাটিও ব্যবহার করা হয়। সমাজের যে অংশের মানুষ নানা সময়ে অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হন, তাদের বসতির মাটি কেন দেবীর প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত- তা নিয়ে অনেকেরই কৌতূহল রয়েছে।

বাংলার লোকাচারে পতিতালয়ের মাটি ‘পুণ্যমাটি’ বা ‘নিষিদ্ধপল্লির মাটি’ নামে পরিচিত। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, দুর্গাপ্রতিমা তৈরির জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে এই মাটিও মেশানো হয়। তবে অঞ্চল, প্রতিমাশিল্পী ও স্থানীয় রীতিভেদে এর ব্যবহার একরকম নয়। কোথাও এই প্রথা সরাসরি পালন করা হয়, আবার কোথাও এর প্রতীকী তাৎপর্য তুলে ধরা হয়।


লোকাচার অনুযায়ী, এই মাটি সংগ্রহের ক্ষেত্রে দান ও সম্মতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রচলিত রীতির বর্ণনায়, পুরোহিত বা প্রতিমাশিল্পী মন্ত্র উচ্চারণ করে যৌনপল্লির বাসিন্দাদের কাছে মাটি চান। তারা স্বেচ্ছায় মাটি দিলে, তা প্রতিমা তৈরির উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা হয় বলে উল্লেখ রয়েছে।

এই রীতির পেছনে একটি বহুল প্রচলিত লোকবিশ্বাস রয়েছে। বলা হয়, পুরুষেরা পতিতালয়ে গিয়ে নিজেদের পুণ্য সেখানে রেখে পাপ নিয়ে ফিরে আসেন। সেই বিশ্বাস থেকেই পতিতালয়ের মাটিকে পুণ্যময় বলে বিবেচনা করার ধারণা তৈরি হয়েছে। তবে, এটি মূলত লোককথাভিত্তিক ব্যাখ্যা; এর ঐতিহাসিক উৎস ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি সম্পর্কে সব বক্তব্যের পক্ষে সমানভাবে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।


পতিতালয়ের মাটি ব্যবহারের রীতির আরেকটি আলোচিত ব্যাখ্যা সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে ঘিরে। সমাজের যে মানুষদের একটি অংশ অবহেলা বা বৈষম্যের চোখে দেখে, তাদের বসতির মাটি দেবীর প্রতিমায় ব্যবহার করার বিষয়টিকে অনেকে প্রতীকী তাৎপর্যে ব্যাখ্যা করেন।

দুর্গাকে মাতৃরূপে কল্পনা করা হয়। সেই ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে কেউ কেউ মনে করেন, এই রীতি সমাজের প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্ব ও মর্যাদাকে স্বীকার করার বার্তা দেয়। অর্থাৎ, সমাজ যাদের দূরে সরিয়ে রাখে, তারাও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ- এই ধারণার প্রতিফলন হিসেবে অনেকে প্রথাটিকে দেখেন।


তবে, এটি রীতিটির একটি সামাজিক ব্যাখ্যা মাত্র। এর অর্থ ও তাৎপর্য নিয়ে সবার দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। তাই একে একমাত্র ধর্মীয় ব্যাখ্যা হিসেবে না দেখে লোকবিশ্বাস, আচার ও সামাজিক চিন্তার সম্মিলিত প্রকাশ হিসেবে দেখাই যুক্তিযুক্ত।

কীভাবে সংগ্রহ করা হয় এই মাটি?

প্রচলিত বর্ণনায়, পুরোহিত বা প্রতিমাশিল্পী যৌনপল্লিতে গিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের কাছ থেকে মাটি সংগ্রহ করেন। এ ক্ষেত্রে মাটি চাওয়া, তা দান করা এবং প্রতিমা তৈরির উপকরণের সঙ্গে মেশানোর বিষয়টি ধর্মীয় আচারের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। লোকাচারের বর্ণনায় মাটি দানকারীর স্বেচ্ছাসম্মতি ও সদিচ্ছার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে, সব জায়গায় একই পদ্ধতিতে এই মাটি সংগ্রহ করা হয় না। কোথাও রীতিটি সরাসরি অনুসরণ করা হয়, আবার কোথাও এর প্রতীকী দিকটিই বেশি গুরুত্ব পায়।


প্রচলিত পৌরাণিক ও লোককথা

পতিতালয়ের মাটি ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করতে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ও লোককথা প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে একটি কাহিনিতে দেবী পুরাণের উল্লেখ করে বলা হয়, এক কিশোরী যৌনকর্মীকে দেবী স্বপ্নে দেখা দিয়ে আশ্বস্ত করেন এবং তার পূজায় ওই নারীর আঙিনার মাটির প্রয়োজন হবে বলে জানান। এই কাহিনির ব্যাখ্যায় বলা হয়, সমাজ যাদের অবহেলা করে, দেবী তাদেরও আপন করে নেন। তবে, কাহিনিটির শাস্ত্রীয় উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

আরেকটি জনপ্রিয় লোককথা অনুসারে, একবার কয়েকজন যৌনকর্মী গঙ্গায় স্নান করতে যাওয়ার পথে এক কুষ্ঠরোগীকে দেখতে পান। তিনি অন্যদের কাছে গঙ্গাস্নানে সাহায্য চাইলেও কেউ এগিয়ে আসেননি। পরে ওই নারীরা তাকে সাহায্য করেন। কাহিনি অনুযায়ী, সেই কুষ্ঠরোগী ছিলেন স্বয়ং শিব। তাদের আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে শিব নিজের প্রকৃত রূপ প্রকাশ করেন এবং বর চাইতে বলেন। তখন নারীরা তাদের উঠানের মাটি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির বর চান। শিব সেই বর দেন এবং সেখান থেকেই এই প্রথার সূচনা হয় বলে লোককথায় বর্ণিত রয়েছে।

সূত্র : নিউজ এইটটিন, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   দুর্গাপ্রতিমা  পতিতালয়  মাটি  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: