অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত আগামী দুই বছরের মধ্যে জ্বালানি সংকট কেটে যাওয়াসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সোমবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে ‘টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা কাল বা পরশুই সব সমস্যার সমাধান করে ফেলব— এমন কথা বলে জনগণকে ভুল আশা দেওয়ার কোনো মানে হয় না। আমাদের অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম দুই বছরের মধ্যে জ্বালানি খাতসহ পুরো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনা হবে। তৃতীয় বছরে অর্থনীতি গতি নেবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে গিয়ে অর্থনীতি পূর্ণমাত্রায় ঘুরে দাঁড়াবে। এর চেয়ে ভালো বা চটজলদি কোনো আশা দেওয়াটা ভুল হবে, আর আমি তা করতে চাই না।
বক্তব্যের শুরুতে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও জ্বালানি খাতের বাস্তবতা তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছি। তার ওপর যোগ হয়েছে আগের আমলের বিপুল পরিমাণ দেনা ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত দায়।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দুর্ভাগ্যবশত বর্তমানে আমাদের ব্যবসা পরিচালনার খরচ অনেক বেশি এবং ব্যবসা করার সহজলভ্যতার সূচকও বেশ নিম্নমুখী। আমরা দীর্ঘকাল ধরে একটি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণনির্ভর দেশ হিসেবে চলেছি। এই অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভেঙে দুটি আলাদা সংস্থায় রূপান্তর করা হচ্ছে— একটি নীতিমালা তৈরি করবে এবং অন্যটি তা বাস্তবায়ন করবে। এই বড় সিদ্ধান্তটি সব বাধা সত্ত্বেও আমরা নিয়েছি।
জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এক বা দেড় দশক ধরে আমরা নিজস্ব গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধান করিনি। এটিই এখন আমাদের প্রধান কাজ। বাপেক্সকে দিয়ে ৫০টি নতুন কূপ খননের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং পিএসসি (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) চুক্তি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। স্থলভাগ ও সমুদ্র— উভয় অঞ্চলেই (অফশোর ও অনশোর) অনুসন্ধান করা হবে। পাশাপাশি আমরা অন্তত ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। এর অংশ হিসেবে সৌরবিদ্যুতের অবকাঠামোর ওপর সব ধরনের কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশ থেকে প্রায় ২৩৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে যাওয়ার কারণে ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজার মারাত্মক ধসের মুখোমুখি হয়েছিল। তবে বর্তমানে ব্যাংকিং খাত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক সংকেত দেখা যাচ্ছে। আমাদের পকেট থেকে ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত সাত বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে গেছে, সামনে আরও কী আসবে, তা জানা নেই।
দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধানেও জোর দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তিন থেকে চারটি নতুন ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব টার্মিনাল স্থাপনে কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা যুক্ত হচ্ছেন বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু জিওং, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ম তামিম, বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ ও এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক। প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মাহবুব উর রহমান।
এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি