‘ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের যুক্তরাজ্য শাখা। সংগৃহীত ছবি ব্রিটেনের কয়েকটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রতিবাদ করায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নানা ধরনের শাস্তি ও বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফিলিস্তিনপন্থী স্লোগান দেওয়া, হাততালি কিংবা ঐতিহ্যবাহী কেফিয়া পরার মতো কর্মকাণ্ডের জেরে কারও শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে, কাউকে ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো শিক্ষার্থীর ভিসা হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য পরিচিত ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শান্তিপূর্ণ ফিলিস্তিনপন্থী প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণের এমন প্রবণতা উদ্বেগজনক।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের যুক্তরাজ্য শাখা। সংস্থাটির দাবি, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় শান্তিপূর্ণ ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকে ‘বিশৃঙ্খলা’ হিসেবে চিহ্নিত করে তা বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন সভা বাতিল, প্রতিবাদী শিবির উচ্ছেদ এবং বিক্ষোভ ঠেকাতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৩২ বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা পর্যালোচনা
প্রতিবেদন তৈরিতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ সময় ১৩২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা পর্যালোচনার পাশাপাশি ২৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ৪০টি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে অ্যামনেস্টি।
অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের মতো প্রতিষ্ঠানে ফিলিস্তিনপন্থী প্রতিবাদ ঘিরে নেওয়া বিভিন্ন ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রন্থাগারসহ বিভিন্ন স্থাপনায় প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ এবং দীর্ঘ তদন্ত চালানোর অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫ সালে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানে প্রতিবাদ ঠেকাতে আদালতের শরণাপন্ন হয় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য ছিল, নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে সাত শিক্ষার্থীর স্বল্পস্থায়ী প্রতিবাদের পর তাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরে প্রয়োজনীয় সহায়তাসেবা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে নিষেধাজ্ঞার শর্ত পরিবর্তন করা হয় বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বরখাস্তের শিকার মিসরীয় শিক্ষার্থী
অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে কিংস কলেজ লন্ডনের মিসরীয় শিক্ষার্থী উসামা গানেমের ঘটনাও উঠে এসেছে। ২২ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থীকে ২০২৫ সালে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তার অভিযোগ, তাঁকে নিজ দেশেও ফিরে যেতে বলা হয়েছিল।
উসামা বলেন, ‘মিসরের কর্তৃত্ববাদী শাসন ছেড়ে এসে কিংস কলেজে আরেকটির মুখোমুখি হয়েছি।’
তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসে। প্রতিবেদনের পর্যালোচনার সময়সীমা শেষ হওয়ার পর, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পর্যালোচনার ভিত্তিতে তাঁর বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের যুক্তরাজ্য শাখার প্রধান নির্বাহী কেরি মস্কোগিউরি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের মুক্তচিন্তাকে উৎসাহিত করার কথা, সেখান থেকেই মতপ্রকাশ ও প্রতিবাদের অধিকারের ওপর আঘাত আসছে।
বিদেশি ও সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের ওপর বেশি চাপের অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি, আরব, মুসলিম ও বিদেশি শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি চাপের মুখে পড়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
অ্যামনেস্টির মতে, সরকারি চাপ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বেসরকারি পরামর্শকদের প্রভাবের কারণে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণের কৌশলে মিল দেখা যায়।
তবে এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা আইনসম্মত মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্ভাব্য আইনভঙ্গের ঘটনায় যথাযথ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিতের আহ্বান
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয় ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষেত্রে ভয় ও শাস্তির পরিবেশ তৈরির জায়গা হতে পারে না। বরং এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
এ কারণে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ