ছবি : সংগৃহীত বহুধর্মের নানান রীতি মিশে আছে বাংলাদেশের মানুষের প্রাণে। পরশি হলো এ ভূখণ্ডের মানুষের আশ্রয়ের নাম। প্রতিবেশীর কষ্টে তারা কষ্ট পায়, আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়। কেবল ভিন্ন ধর্মের প্রতিবেশীর দেওয়া খাবারের প্রসঙ্গে এলেই মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের নামে ভুল মাসালা। এবং তাতে দাগ পড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্যানভাসে। ফলে কোনো রকম বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে মুসলিম হিসেবে আগে ইসলামের বিধান জানা জরুরি। কারণ ‘নাড়ু-বাতাসায়’ একজন ঈমানদারের ঈমান নষ্ট হতে পারে না, যদি তিনি সচেতন ও জ্ঞানী হন। কারণ ইসলাম কোনো জটিলতার পথে না গিয়ে তার অনুসারীকে সহনশীল ও বিচক্ষণ হওয়ার পরামর্শ দেয়।
খাবারের গ্রহণের বিষয়ে ইসলাম কিছু মৌলিক শর্ত দিয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো- আপনি যে খাবার গ্রহণ করছেন সেটিকে অবশ্যই হালাল (উপাদানগত) হতে হবে। একইসঙ্গে সৎপথে উপার্জিত হতে হবে। ফলে কোনো মুসলিম যদি নিজের ‘কালো’ টাকায় খাবার কিনে খান সেটাও হালাল হয়ে যায় না। এবং ভিন্ন ধর্মের প্রতিবেশীর দেওয়া খাবারের ক্ষেত্রেও একই মৌলিক শর্তপূরণ করতে হয়- অবশ্যই সে খাবার হালাল (উপাদানগত) হতে হবে।
অমুসলিম প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশা, উপহার দেওয়া কিংবা তাদের কাছ থেকে উপহার নেওয়ার বিষয়ে ইসলামে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। এসব বিধান সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে ধর্মীয় বিষয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। ঈমান ও ধর্মীয় বিশ্বাস অক্ষুণ্ন রেখেও হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে একসঙ্গে বসবাস করা সম্ভব।
খাবার নিয়ে ঈমান থাকা-না থাকার লড়াইয়ে যাওয়ার আগে বোঝার সুবিধার্থে খাবারকে দুটি প্রধান ভাগে আলাদা করে নেওয়া যাক। এক. প্রতিবেশীর জন্য দেওয়া উপহার। দুই. দেব-দেবীর পূজায় উৎসর্গ করা খাবার।
সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে প্রসাদ বিতরণ করেন। এ প্রসাদ গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর উপাদান ও যা দিয়ে প্রস্তুত করা হয়, তা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। পরিচিত ব্যক্তি, শিক্ষক, বন্ধু কিংবা প্রতিবেশী প্রসাদ দিলে সেটি কী দিয়ে তৈরি, তা জানা না থাকলে অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
প্রসাদের উপাদান সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের তথ্য প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চগব্যের কথাও উল্লেখ করা হয়। হিন্দুধর্মীয় রীতিতে পঞ্চগব্য বলতে সাধারণত গোবর, গোমূত্র, দুধ, ঘি ও দইয়ের সমন্বয়কে বোঝানো হয়। কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে এটি ব্যবহৃত হয়। তবে সব পূজার প্রসাদে পঞ্চগব্য বা গো-চনা ব্যবহার করা হয়—এমন দাবি করার আগে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা প্রয়োজন। কারণ, প্রসাদের উপাদান একেক ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, কোনো খাবারের উপাদান হারাম হলে তা খাওয়ার অনুমতি নেই। তাই খাবারে কী উপাদান রয়েছে, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো খাবারে হারাম বা অপবিত্র উপাদান থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হলে তা পরিহার করতে হবে। একইভাবে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদ্দেশে উৎসর্গ করা খাবার গ্রহণের বিষয়টিও ইসলামি বিধানের আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে কোনো খাবার শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তৈরি বা তাদের কাছ থেকে পাওয়া বলেই সেটিকে হারাম বলা যায় না। খাবারের উপাদান, প্রস্তুতকারক বস্তু এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পূজার সময় অনেক হিন্দু পরিবার মুসলিম প্রতিবেশীদের আপ্যায়নের জন্য আলাদাভাবে খাবার তৈরি করে থাকেন। যেমন—নাড়ু, খই ও পিঠাপুলি। এসব খাবার হালাল উপাদান দিয়ে তৈরি হলে এবং তাতে অন্য কোনো নিষিদ্ধ উপাদান না থাকলে শুধু প্রস্তুতকারীর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সেগুলোকে হারাম বলা যায় না।
অন্যদিকে, মাংস ও রান্না করা খাবারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পশু জবাইয়ের পদ্ধতি, জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে কি না এবং মাংসটি ইসলামি বিধান অনুযায়ী হালাল কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খাবারের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কুরআনে ما أهل لغير الله বলতে এজাতীয় খাবারই বোঝানো হয়েছে।
কোরআনে মুমিনদের এমন ব্যক্তিদের অন্তরঙ্গ মিত্র হিসেবে গ্রহণ না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে, যারা তাদের ক্ষতি করতে চায় এবং তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে। এ প্রসঙ্গে সুরা আলে ইমরানের ১১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِنْ دُونِكُمْ
অর্থ : ‘হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের বাইরের কাউকে অন্তরঙ্গ সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ কোরো না।’ (সুরা ইমরান, আয়াত ১১৮)
এ আয়াতে অন্তরঙ্গ সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্কতার নির্দেশনা রয়েছে। একইভাবে সুরা মায়েদার ৫১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ
অর্থ : ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের নিজেদের অভিভাবক বা ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে গ্রহণ কোরো না।’
সুরা নিসার ১৪৪ নম্বর আয়াতেও মুমিনদের বাদ দিয়ে অবিশ্বাসীদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে গ্রহণ না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
এসব আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সামাজিক সৌজন্য, প্রতিবেশীর অধিকার, উপহার বিনিময় এবং ধর্মীয় আনুগত্যের বিষয়গুলোকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোরআনের এসব আয়াতকে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সব ধরনের স্বাভাবিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ করার অর্থে ব্যাখ্যা করা সমীচীন নয়।
এ বিষয়ে সুরা আল-মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যারা ধর্মের কারণে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করেনি এবং তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি।
সুতরাং, অমুসলিম প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের দেওয়া খাবার গ্রহণের বিষয়টি এক নয়। খাবারের উপাদান, প্রস্তুতপ্রণালি ও ধর্মীয় তাৎপর্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে ন্যায়সংগত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
সময়ের আলো/এসএকে