দুই সন্তানকে রেখে চলে গেলেন সোহেল, বাবাকে হারিয়ে দুশ্চিন্তায় এসএসসি পরীক্ষার্থী মেহেদীসংসারের হাল ধরতে প্রতিদিনের মতো বাস নিয়ে বের হয়েছিলেন মো. সোহেল রানা (৪০)। তার আয়ের ওপর নির্ভর করত পরিবারের জীবনযাত্রা। ছেলে মেহেদী এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। মেয়ে মিম এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। সন্তানদের নিয়ে ছিল নানা স্বপ্ন। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনায় সবকিছু যেন মুহূর্তেই থমকে গেল।
গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান সোহেল রানা। তার মৃত্যুর খবরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী-ফরাদপুর গ্রামের বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনকে হারানোর বেদনার পাশাপাশি এখন পরিবারটির সামনে বড় হয়ে উঠেছে দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা।
সোহেল রানার ছেলে মেহেদীর বয়স ১৬ বছর। সে প্রেমতলী সুখবাসিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এবার তার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা। মেয়ে মিমের বয়স ১৮ বছর। তিনি প্রেমতলী কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাবাকে হারিয়ে দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেছেন পরিবার এখন।
সোহেল রানার বাবা মো. আব্দুল হাকিম। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন সোহেল। জীবিকার তাগিদে বাস চালিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি আর্থিক ও মানসিক সংকটের মুখে পড়েছে।
নাটোর বড়াইগ্রামে প্রাণ গেল ১৪ জনের এর মধ্যে গোদাগাড়ী চালক মো. সোহেল রানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার সরকারপাড়া এলাকায় আরপি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে যানবাহন দুটির সামনের দিকে দুমড়েমুচড়ে যায়।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নয়জনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও পাঁচজন মারা যান। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪। আহত হন অন্তত ২৫ জন। উদ্ধার করা আহত ব্যক্তিদের নাটোরের বিভিন্ন হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
নিহত ব্যক্তিদের একজন সোহেল রানা। তার বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী-ফরাদপুর গ্রামে।
পরিবারের একজন মানুষের মৃত্যুতে একটি পরিবারের জীবনে কতটা পরিবর্তন আসে, সোহেল রানার পরিবারের পরিস্থিতি তারই একটি উদাহরণ। বাবাকে হারানোর শোক এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি এখন তার দুই সন্তানের।
বিশেষ করে ছেলে মেহেদীর সামনে এসএসসি পরীক্ষা। এই সময়ে বাবার অনুপস্থিতি তার মানসিক অবস্থার ও পরিবারের পর প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে, উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করার সময়ে বাবাকে হারিয়েছেন মিমও।
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি শুধু একটি জীবন কেড়ে নেয় না, একটি পরিবারের আয়ের উৎসও বন্ধ হয়ে যায়। সে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া, দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব তখন পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর এসে পড়ে।
সোহেল রানার পরিবারের ক্ষেত্রেও সামনে রয়েছে এমন নানা চ্যালেঞ্জ। স্বজন হারানোর শোকের পাশাপাশি সন্তানদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যাবে, সেই প্রশ্নও এখন এলাকাবাসীর ।
নাটোর বড়াইগ্রামের ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ১৪ জন পরিবারের প্রত্যেকের পেছনেই রয়েছে একটি করে পরিবার, স্বজন ও জীবনের গল্প। সোহেল রানার ক্ষেত্রে সেই গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
সময়ের আলো/জোই