গ্রাফিক : সময়ের আলোঅস্ত্র বিতর্কের মুখে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের পরও আলোচনা থামছে না। ইশরাক হোসেন নিজেও আলোচনা জিইয়ে রেখেছেন। রোজ সামাজিকমাধ্যমে নতুন নতুন তথ্য-প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
তবে তিনি যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান, তা অনেকটা স্পষ্ট। সেই প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। তার অনুসারী নেতাকর্মীরা দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় পোস্টারিং করে ভোটে লড়াইয়ের জানান দিচ্ছে। আপাতত বিএনপির হাইকমান্ডের ওপর ভরসা রেখে তার ওপর পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিতে চান ঢাকা-৬ আসনের এমপি ইশরাক হোসেন।
মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় মন্ত্রিসভা থেকে ছিটকে পড়েছেন ইশরাক হোসেন। তার পদত্যাগের পর অনেকে ঢাকা নগরীর আসন্ন মেয়র নির্বাচনে আগেভাগেই তার ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তারা বলেন, আসলে ইশরাক হোসেন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল ঢাকা দক্ষিণের মেয়র হওয়া। কারণ তার বাবা সাদেক হোসেন খোকা অবিভক্ত ঢাকার মেয়র ছিলেন। তার ক্লিন ইমেজ ও পরিচিতির কারণে মাঠ পর্যায়ের বেশিরভাগ নেতাকর্মীই ইশরাককে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান। ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর বাবার মৃত্যুর পর সামনে আসেন তার ছেলে ইশরাক হোসেন। পেশায় ব্যবসায়ী, পড়াশোনা প্রকৌশল বিদ্যায়ের স্নাতকোত্তর। উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন বিদেশে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্যও ছিলেন। ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির এক নম্বর সদস্যও তিনি। পুরান ঢাকায় দলীয় কর্মসূচি, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং নির্বাচনি প্রচারে সক্রিয় অংশগ্রহণ ইশরাককে তরুণ কর্মীদের কাছে পরিচিত করে তোলে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাও অর্জন করেন তিনি।
২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন ইশরাক হোসেন। সাহসী প্রচারের মাধ্যমে আলোচনায় চলে আসেন। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ভোটে হেরে যান। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস জয়ী হন। ফল প্রত্যাখ্যান করে ইশরাক আইনি লড়াই শুরু করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল তাকে মেয়র ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু তাকে শপথ পড়ানো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। শেষপর্যন্ত টানা আন্দোলন করেও মেয়রের চেয়ারে বসতে পারেননি ইশরাক হোসেন।
এবার ভোটে ইশরাক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) মেয়র হতে চান। বাবার চেয়ার ধরে রাখতে চান। তিনি ছাড়াও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় আছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ডিএসসিসির বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন। এ ছাড়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলকে নিয়েও নেতাকর্মীদের একটি অংশের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ-উৎসাহ রয়েছে। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এমনকি বাংলাদেশে রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক মামলাও দায়ের করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ইশরাক হোসেনের ঘনিষ্ঠজন ও তার প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা সময়ের আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কথার বাইরে যাবেন না ইশরাক হোসেন। এখন তিনি এমপির দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা-৬ সংসদীয় আসনের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। দল যদি তাকে ভবিষতে মেয়র নির্বাচনের অনুমতি দেয় তা হলে এমপি থেকে পদত্যাগ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচন করবেন। দলের বাইরে গিয়ে ভোট করার প্রশ্নই আসে না। দল অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলে তার পক্ষেই কাজ করবেন ইশরাক হোসেন।
তবে ইশরাক হোসেনের অভিপ্রায় জানতে চাইলে তাকে টেলিফোনে পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে ইশরাক হোসেন বলেন, এক ভয়াবহ চক্রান্ত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছেন। আল্লাহর রহমতে দেশনায়ক তারেক রহমান আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহের চোখে দেখেন এবং সবসময় আমার জন্যে কোনটা ভালো সেটি চিন্তায় রাখেন।
পোস্টে তিনি লেখেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে এযাবৎকালের সেরা পরামর্শটি দিয়েছিলেন যা আমি একবাক্যে মেনে নিয়েছিলাম। প্রথমে শাস্তি মনে হয়েছিল কিন্তু সবার আগে তিনিই পরিষ্কার বুঝে ফেলেছিলেন যে একটি গণমাধ্যম ও কমন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী আমার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও ক্ষতিকর একটি পরিকল্পনা সাজিয়ে রেখেছে।
দক্ষিণ বিএনপির একাধিক নেতা সময়ের আলোকে জানান, তারা দলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। দল যাকে কেন্দ্র থেকে সমর্থনের ঘোষণা দেবে, তার পক্ষেই তারা কাজ করবেন। তবে এখন সব প্রার্থীর আলাদা কর্মীসমর্থক শুভাকাঙ্ক্ষীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় সেই প্রমাণও মিলেছে। বড়সরো পোস্টার-ফেস্টুন টানানো হয়েছে— যেখানে লেখা আছে ইশরাক হোসেনকে মেয়র হিসেবে দেখতে চাই।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে