সংগৃহীত ছবিডিজিটাল সেবার আওতায় দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আনতে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিমালা চূড়ান্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬’ শীর্ষক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে স্মার্টফোনের সর্বনিম্ন দাম প্রায় ১০ হাজার টাকা। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে স্মার্টফোন পৌঁছে দিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগসহ সরকার স্বল্পমূল্যের স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব ফোনের দাম চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) এক গবেষণা বা জরিপ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও ডিজিটাল সেবার বিস্তার বাড়ানো প্রয়োজন।
চীনভিত্তিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের অংশীদারত্বে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনে বাংলাদেশের সংযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডিজিটাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তিনটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র তুলে ধরেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেন, সেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল সেবার আওতায় আনতে নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ব্রডব্যান্ড এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
শুধু সংযোগ স্থাপন নয়, শিল্পের দক্ষতা, সরবরাহব্যবস্থা, গ্রাহকসেবা ও নাগরিক সেবার মান বাড়াতে বাস্তবমুখী ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োগ জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মন্ত্রী আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল কাজে লাগাতে পর্যাপ্ত কম্পিউটিং ও ডেটা সক্ষমতা তৈরি, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং গবেষণার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক সক্ষমতা সরাসরি প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, তরুণ প্রজন্মকে ক্ষমতায়ন এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রযুক্তিকে উন্নয়নের প্রধান অনুঘটক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ডিজিটাল ব্যবধান কমানো বড় চ্যালেঞ্জ
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল সক্ষমতায় বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় ১০ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ এবং এর অর্থবহ ব্যবহারের মধ্যকার ব্যবধান কমানো চলতি দশকের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
এ ক্ষেত্রে সরকারের চারটি মূলনীতি তুলে ধরে তিনি বলেন, এককভাবে সরকারের পক্ষে ডিজিটাল রূপান্তর সম্ভব নয়। সরকারের দায়িত্ব পূর্বাভাসযোগ্য নীতিমালা, স্বচ্ছ অনুমোদনব্যবস্থা ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে শিল্পখাতের দায়িত্ব উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে মানসম্মত সেবা পৌঁছে দেওয়া।
কামরুজ্জামানের তুলে ধরা চারটি মূলনীতির মধ্যে রয়েছে অর্থবহ সংযোগ নিশ্চিত করা, নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো, প্রযুক্তিতে চাহিদাভিত্তিক বিনিয়োগ এবং সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন।
তিনি বলেন, শুধু ইন্টারনেটের সংকেত থাকলেই হবে না; সাশ্রয়ী ডিভাইস ও ব্যবহারযোগ্য ডেটা প্যাকেজও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের আওতা বাড়ানো, ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত সক্ষমতা রাখা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর দ্রুত সেবা পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থাও জরুরি।
প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রেও বাস্তব চাহিদা, ব্যয় ও অবকাঠামোগত সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। তাঁর মতে, সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং এআইয়ের জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত না হলে ডিজিটাল সেবার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হবে না।
৫-৬ মাসের মধ্যে চূড়ান্ত হতে পারে এআই নীতিমালা
আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে এআই নীতিমালা চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত সময়সূচি বা নীতিমালার চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি আর কিছু জানাননি।
ডিজিটাল প্রবৃদ্ধিতে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি হুয়াওয়ের
অনুষ্ঠানে হুয়াওয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট জেসন উ বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে সরকার এবং শিল্পখাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হুয়াওয়ে।
তিনি বলেন, সংযোগব্যবস্থা, ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিতে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানো, নতুন সেবা উদ্ভাবন এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্মসচিব সাইদা আফরোজ।
সময়ের আলো/কেএইচও