গ্রাফিক : সময়ের আলোএকটি পরিবারে নতুন অতিথির আগমনের সংবাদ মানেই আনন্দ, অপেক্ষা আর অসংখ্য স্বপ্ন। অনাগত সন্তানকে ঘিরে মা-বাবা কত কিছু ভাবেন— তার ছোট্ট হাত ধরে হাঁটবেন, প্রথমবার ডাক শুনবেন, তাকে ঘিরে গড়ে তুলবেন আগামীর পৃথিবী। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই যখন প্রশ্ন ওঠে, ‘সন্তানটি ছেলে, না মেয়ে?’ তখন প্রশ্নটি সব সময় নিছক কৌতূহলে সীমাবদ্ধ থাকে না। কখনো এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে বংশরক্ষার অহংকার, উত্তরাধিকারের হিসাব, সামাজিক প্রত্যাশা কিংবা কন্যাসন্তানকে ঘিরে অযৌক্তিক আশঙ্কা। সমস্যা সন্তানের লিঙ্গ জানার প্রশ্নে নয়; সমস্যা তখনই, যখন সেই পরিচয় দিয়ে তার মূল্য নির্ধারণ করা হয়। যে সমাজে জন্মের আগেই একটি শিশুকে ছেলে না মেয়ে— এই পরিচয়ের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে দাঁড় করানো হয়, সেখানে বৈষম্যের শুরুটা আর জন্মের পর নয়, গর্ভাবস্থাতেই।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। আল্ট্রাসনোগ্রাফির মতো প্রযুক্তি গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি, অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় ধারণা দেয়। মা ও শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করা, সম্ভাব্য জটিলতা শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়াই এ ধরনের পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। কিন্তু চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যবহৃত প্রযুক্তি যখন সামাজিক পছন্দ-অপছন্দের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে তার ব্যবহার নিয়ে, প্রযুক্তির অস্তিত্ব নিয়ে নয়। বিজ্ঞান আমাদের জানার সুযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু কী জানা উচিত, কেন জানা উচিত এবং সেই জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করা উচিত— এসব প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান একা দিতে পারে না। সেখানে প্রয়োজন নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক বিবেচনা।
ছেলে চাই, মেয়ে নয়— এই মানসিকতার শিকড় কোথায়? আমাদের সমাজে ছেলেসন্তানকে ঘিরে বিশেষ প্রত্যাশা বহুদিনের। বংশের নাম টিকিয়ে রাখা, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বার্ধক্যে মা-বাবার দেখাশোনা কিংবা সামাজিক মর্যাদা— এসব যুক্তি দেখিয়ে অনেক পরিবারে ছেলেকে মেয়ের চেয়ে বেশি কাঙ্ক্ষিত মনে করা হয়। বিপরীতে মেয়েসন্তানকে কখনো বাড়তি দায়িত্ব, কখনো ভবিষ্যতের উদ্বেগ হিসেবে দেখা হয়। সময় বদলেছে, শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, নারীরা কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। তবু সমাজের কিছু অংশে পুত্রসন্তানের প্রতি পক্ষপাত এখনও রয়ে গেছে। এই মানসিকতার সবচেয়ে নির্মম দিক হলো, সন্তানের লিঙ্গের জন্যও কখনো মাকে দায়ী করা হয়। ছেলে না হলে তাকে কটূক্তি শুনতে হয়, পারিবারিক চাপের মুখে পড়তে হয়, কখনো সহ্য করতে হয় অপমান। অথচ সন্তানের জৈবিক লিঙ্গ নির্ধারণে মায়ের ইচ্ছাকৃত কোনো ভূমিকা নেই। তবু পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভুল ধারণার দায় অনেক সময় নারীকেই বহন করতে হয়। আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন গর্ভের শিশুর লিঙ্গ জানার তথ্যকে তার জন্মের অধিকার নির্ধারণের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ছেলে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে কন্যাসন্তানকে প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়; এটি নারীর মর্যাদা, শিশুর অধিকার এবং সমাজের ন্যায়বোধের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। তবে এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। গর্ভের শিশুর লিঙ্গ সম্পর্কে তথ্য জানা, চিকিৎসাগত প্রয়োজনে পরীক্ষা করা এবং লিঙ্গের কারণে গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়। এগুলোর উদ্দেশ্য ও পরিণতি আলাদা। চিকিৎসার প্রয়োজনকে অস্বীকার করা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি প্রযুক্তির সাহায্যে পাওয়া তথ্যকে বৈষম্য বা ক্ষতিকর সিদ্ধান্তের ভিত্তি করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান আল্লাহর দান। তার মর্যাদা ছেলে বা মেয়ে হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন’ (সুরা আশ-শুরা, আয়াত : ৪৯)। পরের আয়াতে উভয় ধরনের সন্তান দানের কথাও এসেছে। অর্থাৎ সন্তান ছেলে হবে, না মেয়ে— এ নিয়ে মানুষের অহংকার কিংবা হীনম্মন্যতার কোনো ভিত্তি নেই। কুরআন এমন এক মানসিকতারও নিন্দা করেছে, যেখানে কন্যাসন্তানের জন্মসংবাদ শুনে মানুষের মুখ কালো হয়ে যেত এবং সে লজ্জা ও অস্বস্তিতে পড়ত। সুরা আন-নাহলের ৫৮ ও ৫৯ নম্বর আয়াতে এই আচরণের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কন্যাসন্তানকে অবজ্ঞা করা যে মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী, কুরআনের এই বক্তব্য তা স্পষ্ট করে। ইসলাম সন্তানকে দায়িত্ব ও আমানত হিসেবে গ্রহণ করতে শেখায়। ছেলে হোক কিংবা মেয়ে— তার প্রতি ন্যায়বিচার, স্নেহ, নিরাপত্তা ও যত্ন নিশ্চিত করা মা-বাবার দায়িত্ব। কন্যাসন্তানের জন্মকে দুর্ভাগ্য মনে করা কিংবা তাকে পরিবারের বোঝা ভাবা ইসলামি নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে লিঙ্গ শনাক্তকরণ বা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অবশ্যই চিকিৎসাগত প্রয়োজন, পদ্ধতির ধরন এবং সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনা করতে হবে। ইসলামি চিকিৎসা-নৈতিকতার গবেষণায় সামাজিক পছন্দের ভিত্তিতে লিঙ্গ নির্বাচন নিয়ে গুরুতর আপত্তি তুলে ধরা হয়েছে, বিশেষত যখন তা বৈষম্যকে উৎসাহিত করে বা কোনো শিশুর প্রতি অবিচারের ঝুঁকি তৈরি করে। তবে আধুনিক চিকিৎসার প্রতিটি পরিস্থিতির বিধান এক কথায় নির্ধারণ না করে নির্ভরযোগ্য ফিকহি মতামত ও চিকিৎসাগত বাস্তবতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। ধর্মের মূল শিক্ষা এখানে পরিষ্কার: সন্তানের লিঙ্গের কারণে তার প্রতি অবজ্ঞা, অবিচার কিংবা ক্ষতিকর আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে গ্রহণ করার মানসিকতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি মানুষের তৈরি বৈষম্য থেকে নিজেকে মুক্ত করাও জরুরি।
বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। আইন সেই সম্ভাবনার দায়িত্বশীল ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করতে পারে, আর ধর্ম ও নৈতিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মানুষের মর্যাদা কোনো বাহ্যিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু এই তিনের শিক্ষা তখনই সার্থক হবে, যখন তা আমাদের আচরণে প্রতিফলিত হবে। গর্ভের শিশুটি ছেলে, না মেয়ে— এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সে পৃথিবীতে এলে আমরা তাকে কতটা ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিতে প্রস্তুত। একটি শিশুর জন্মের আগেই যদি তার মূল্য নিয়ে দরকষাকষি শুরু হয়, তবে সংকটটি কেবল প্রযুক্তির নয়; সংকট আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। লিঙ্গ জানার কৌতূহল যখন বৈষম্যের রাজনীতিতে রূপ নেয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু অনাগত প্রাণ নয়, আমাদের মানবিক বিবেকও। সেই বিবেককে জাগিয়ে তোলাই আজ সবচেয়ে জরুরি। ছেলে বা মেয়ে নয়, প্রতিটি শিশুকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠুক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ। অনাগত প্রাণের প্রতি সম্মান দেখানো শুরু হোক আমাদের ঘর থেকে, আমাদের বিশ্বাস থেকে, আমাদের প্রতিদিনের আচরণ থেকে।
লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই