ছবি : সংগৃহীত সন্তানের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সুন্দর চরিত্র গড়ে তোলা প্রত্যেক মুসলিম অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করলেই হবে না, বরং সেখানে শিক্ষার পরিবেশ কেমন, শিক্ষকরা কীভাবে পড়ান এবং শিশুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
অনেক অভিভাবক সন্তানকে ছোট বয়সেই মাদরাসায় ভর্তি করান। কিন্তু শিশুর বয়স, মানসিক প্রস্তুতি ও আগ্রহ বিবেচনা না করে জোর করে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করলে উল্টো ফল হতে পারে। তাই শিশুর জন্য এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়া জরুরি, যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি তার মানসিক বিকাশ, ভালো আচরণ ও ধর্মের প্রতি ভালোবাসা তৈরির সুযোগ রয়েছে।
তাবেয়ি মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এই ইলমই হলো ধর্ম, সুতরাং তোমরা লক্ষ্য করো, কার কাছ থেকে তোমরা তোমাদের ধর্ম গ্রহণ করছ।’ (মুসলিম, মুকাদ্দিমা, ১/১৪)
তাই সন্তানকে মাদরাসায় ভর্তি করানোর আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
যে ধরনের মাদরাসা বেছে নেবেন
১. আনন্দদায়ক ও শিশুবান্ধব পরিবেশ
বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ হওয়া উচিত আনন্দদায়ক ও মমতাপূর্ণ। এ বয়সে খেলাধুলা ও আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখার সুযোগ থাকলে শিশু সহজে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী হয়।
শিশুকে ভয় দেখিয়ে বা শাস্তি দিয়ে পড়ানোর পরিবর্তে ভালোবাসা ও উৎসাহের মাধ্যমে শেখানো উচিত। এতে কোরআন ও সুন্নাহর প্রতি তার ভালোবাসা তৈরি হওয়ার সুযোগ বাড়ে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সহজ করো, কঠিন কোরো না, সুসংবাদ দাও, দূরে সরিয়ে দিয়ো না।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৯)
২. শিক্ষকের যোগ্যতা ও আচরণ
শুধু মাদরাসার অবকাঠামো বা সুনাম দেখে সন্তানকে ভর্তি করানো ঠিক নয়। শিক্ষকদের যোগ্যতা, ধর্মীয় জ্ঞান, ধৈর্য ও শিশুদের সঙ্গে আচরণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
একজন ভালো শিক্ষক শুধু বইয়ের পাঠ শেখান না, নিজের আচরণ দিয়েও শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করেন। তাই এমন শিক্ষক নির্বাচন করা প্রয়োজন, যিনি শিশুকে ভালোবাসা ও ধৈর্যের সঙ্গে শেখাবেন এবং তার ভুলগুলো সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেবেন।
৩. পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা
ধর্মীয় শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু আরবি শব্দ বা বিভিন্ন বিষয় মুখস্থ করানো নয়। শিশুর মধ্যে সততা, শিষ্টাচার, দায়িত্ববোধ, বড়দের সম্মান এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতি গড়ে তোলাও জরুরি।
তাই এমন প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়া উচিত, যেখানে ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি শিশুর চরিত্র গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে নামাজ, ভালো আচরণ ও নৈতিকতার চর্চা থাকলে শিশু সহজেই সেসব অভ্যাস আয়ত্ত করতে পারে। কারণ, সন্তানের প্রথম শিক্ষালয় তার নিজের পরিবার।
৪. ছোট শিশুদের জন্য অনাবাসিক প্রতিষ্ঠান
খুব অল্প বয়সে সন্তানকে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর আগে তার মানসিক প্রস্তুতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরিবারের সান্নিধ্য থেকে হঠাৎ দূরে থাকলে অনেক শিশুর মধ্যে ভয়, একাকিত্ব বা মানিয়ে নিতে অসুবিধা তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে রাসুল (সা.)-এর একটি হাদিসে পরিবারের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশনা পাওয়া যায়। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক ও মানসিক স্বস্তিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সম্ভব হলে এমন প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়া ভালো, যেখানে তারা পরিবারের সঙ্গে থেকে পড়াশোনা করতে পারে।
৫. বাড়ির কাছাকাছি প্রতিষ্ঠান
শিশুর বয়স কম হলে বাড়ির কাছাকাছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা সুবিধাজনক। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া, যানজটে আটকে থাকা কিংবা যাতায়াতের ক্লান্তি শিশুর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
যাতায়াতে বেশি সময় ব্যয় হলে শিশুর বিশ্রাম, খেলাধুলা ও পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সময়ও কমে যায়। তাই প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের সময় দূরত্ব ও যাতায়াতব্যবস্থা বিবেচনা করা উচিত।
যে ধরনের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর আগে সতর্ক হবেন
১. যেখানে শিশু ভয় পায়
সন্তান প্রতিদিন মাদরাসায় যেতে না চাইলে, সকালে কান্নাকাটি করলে কিংবা সেখানে যাওয়ার কথা শুনে আতঙ্কিত হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এমন আচরণের কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
শিশু ভয় পাচ্ছে কেন, শিক্ষক বা অন্য কারও আচরণে সে কষ্ট পেয়েছে কি না কিংবা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করুন।
শিশু বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে—এমন ধারণা করে জোর করে পাঠাতে থাকলে তার মানসিক কষ্ট বাড়তে পারে। প্রয়োজনে শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলুন এবং পরিস্থিতির উন্নতি না হলে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করুন।
সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন তার ‘আল-মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে শিক্ষাদানে অতিরিক্ত কঠোরতার নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, অতিরিক্ত শাসন শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও আত্মমর্যাদায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
২. বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত পড়ার চাপ
ছোট শিশুদের দীর্ঘ সময় ধরে পড়তে বসিয়ে রাখা বা বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত পড়া মুখস্থ করানোর চাপ দেওয়া উচিত নয়। কারণ, এ বয়সে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা অনেক শিশুর জন্য কঠিন।
শিশুর শেখার ক্ষমতা ও মানসিক প্রস্তুতি বিবেচনা করে পড়ার পরিমাণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, বিশ্রাম ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগও থাকতে হবে।
অতিরিক্ত চাপের কারণে শিশু পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাতে পারে। ধর্মীয় শিক্ষা যেন তার কাছে ভয় বা শাস্তির বিষয় হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে অভিভাবকদের নজর দেওয়া জরুরি।
৩. রূঢ় আচরণ ও অতিরিক্ত কড়াকড়ির পরিবেশ
ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রয়োজন। তবে শৃঙ্খলা বজায় রাখার নামে শিশুর সঙ্গে রূঢ় আচরণ, অপমান কিংবা ভয় দেখানো গ্রহণযোগ্য নয়।
পোশাক, নিয়মকানুন ও ইবাদতের শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি শিশুর বয়স ও অনুভূতির প্রতিও যত্নশীল হতে হবে। রাসুল (সা.) শিশুদের প্রতি কোমল আচরণের শিক্ষা দিয়েছেন। তাই যে প্রতিষ্ঠানে শিশুদের সঙ্গে ধৈর্য ও মমতা নিয়ে আচরণ করা হয় না, সেখানে সন্তানকে ভর্তি করানোর আগে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া উচিত।
সন্তানকে ভর্তি করিয়েই দায়িত্ব শেষ নয়
শিশুকে মাদরাসায় ভর্তি করানোর পরও অভিভাবকদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে। সে কী শিখছে, শিক্ষকদের আচরণ কেমন এবং প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আনন্দিত থাকে নাকি ভীত হয়—এসব বিষয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।
শিশু হঠাৎ মাদরাসায় যেতে না চাইলে বা নিয়মিত অনুপস্থিত থাকলে তাকে বকাঝকা না করে কারণ জানার চেষ্টা করুন। কোনো শিক্ষক বা সহপাঠীর আচরণে সে কষ্ট পাচ্ছে কি না, সেটিও খেয়াল করুন।
প্রয়োজনে কিছুদিন বিরতি দিয়ে কিংবা বাড়িতে কোনো উপযুক্ত শিক্ষকের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে শিশুর নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তিকে সব সময় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ধর্মীয় শিক্ষা মানে শুধু কিছু বিষয় মুখস্থ করানো নয়, বরং শিশুর মধ্যে সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভালোবাসা, নৈতিকতা ও সুন্দর চরিত্র গড়ে তোলা। তাই সন্তানকে মাদরাসায় ভর্তি করানোর আগে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষকের আচরণ এবং শিশুর মানসিক প্রস্তুতি যাচাই করা প্রত্যেক অভিভাবকের দায়িত্ব।
সময়ের আলো/জেডি