গ্রাফিক : সময়ের আলোমাটির ওপরে যে পানি আমরা দেখি, তার বাইরেও মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে জীবনের এক নীরব ভান্ডার— ভূগর্ভস্থ পানি। মানুষের তৃষ্ণা নিবারণ, কৃষির সবুজায়ন, খাদ্য উৎপাদন ও সভ্যতার অগ্রযাত্রায় এই অদৃশ্য সম্পদের অবদান অপরিসীম। অথচ অতিরিক্ত উত্তোলন, দূষণ ও অপচয়ের কারণে অনেক অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও গুণগত মান হুমকির মুখে।
পবিত্র কুরআন পানির গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে মানুষকে আল্লাহর কুদরত উপলব্ধি ও নেয়ামতের যথাযথ মূল্যায়ন করতে শেখায়। তাই ভূগর্ভস্থ পানি কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি জীবন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে জড়িত এক অমূল্য আমানত।
মাটির গভীরে আল্লাহর কুদরতের বিস্ময় : ভূগর্ভস্থ পানি প্রকৃতির এক বিস্ময়কর ব্যবস্থা। বৃষ্টির পানি মাটির বিভিন্ন স্তর ভেদ করে নিচে জমা হয়ে ভূগর্ভস্থ জলাধারকে সমৃদ্ধ করতে পারে। এই অদৃশ্য ভান্ডার থেকেই পৃথিবীর বহু মানুষ
পানীয়জল ও কৃষির পানি পায়।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আকাশ থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করি, অতঃপর তা জমিনে সংরক্ষণ করি। আর নিশ্চয়ই আমি তা অপসারণ করতেও সক্ষম’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ১৮)। আয়াতটি পানির প্রাপ্তি ও সংরক্ষণের বিষয়ে মানুষকে গভীরভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। মাটির নিচে সঞ্চিত পানির প্রতিটি উৎস আমাদের মনে করিয়ে দেয়প্রকৃতির ভারসাম্য কত সূক্ষ্ম, আর মানুষের জীবন কতটা নির্ভরশীল এই নেয়ামতের ওপর।
পানি জীবনের মৌলিক ভিত্তি : পানি ছাড়া জীবনের স্বাভাবিক অস্তিত্ব কল্পনা করা কঠিন। পান করা, রান্নাবান্না, পরিচ্ছন্নতা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণে ভূগর্ভস্থ পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিরাপদ পানির অভাবে মানুষের স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রা ও সামাজিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘প্রাণবান সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করেছি’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৩০)। এ আয়াত জীবনের সঙ্গে পানির গভীর সম্পর্ক তুলে ধরে। সুতরাং নিরাপদ পানির উৎস সংরক্ষণ করা শুধু পরিবেশের দাবি নয়, এটি মানবজীবন রক্ষারও অপরিহার্য শর্ত।
কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার নেপথ্যে : বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে ভূগর্ভস্থ পানির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধানসহ নানা ফসলের সেচে এই পানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। পানি সরবরাহে সংকট দেখা দিলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, যার প্রভাব পড়ে খাদ্যের বাজার ও মানুষের জীবনযাত্রায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বৃষ্টির পানি দ্বারা শস্য ও ফলমূল উৎপাদনের কথা উল্লেখ করেছেন (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ৯৯)। তাই কৃষিতে পানির ব্যবহার হতে হবে পরিকল্পিত ও সাশ্রয়ী। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি উত্তোলন না করে আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করা খাদ্যনিরাপত্তা ও পানির স্থায়িত্বের জন্য জরুরি।
পানির পুনর্ভরণ প্রকৃতির নিজস্ব ব্যবস্থা : বৃষ্টির পানি, নদী-খাল ও জলাশয় থেকে চুইয়ে পড়া পানি মাটির নিচে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ জলাধারকে পুনর্ভরণ করতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়া সব এলাকায় সমান নয়; মাটির ধরন, বৃষ্টিপাত ও ভূমির ব্যবহারের ওপর তা নির্ভর করে। কোনো অঞ্চলে উত্তোলিত পানির তুলনায় পুনর্ভরণ কম হলে পানির স্তর নিচে নেমে যায়।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, যদি তোমাদের পানি ভূগর্ভে চলে যায়, তবে কে তোমাদের প্রবহমান পানি এনে দেবে’ (সুরা মুলক, আয়াত : ৩০)। এই আয়াত পানির প্রাপ্যতা সম্পর্কে মানুষের অসহায়ত্ব ও আল্লাহর নেয়ামতের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই পানির প্রাকৃতিক পুনর্ভরণে সহায়ক পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।
পানি অপচয় নয়, দায়িত্বশীল ব্যবহার : পানি মূল্যবান বলেই এর ব্যবহারেও সংযম জরুরি। ওজু, গোসল, রান্নাবান্না কিংবা পরিচ্ছন্নতার সময় অপ্রয়োজনে পানি নষ্ট করা উচিত নয়। কল খোলা রাখা, ট্যাঙ্ক উপচে পড়তে দেওয়া ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার— এসব অভ্যাস পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানদের ভাই’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৭)। যদিও আয়াতটি সাধারণভাবে অপচয়ের নিন্দা করে, এর শিক্ষা পানির মতো প্রয়োজনীয় সম্পদের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। পানি সাশ্রয়কে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করাই হবে নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতার বাস্তব প্রকাশ।
পানির সংকট মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ : ভূগর্ভস্থ পানি রক্ষায় শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবার, সমাজ, স্থানীয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানিসাশ্রয়ী সেচ, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, জলাশয় রক্ষা এবং পানির স্তর ও গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করে, আল্লাহ কেয়ামতের দিনের তার একটি কষ্ট দূর করবেন’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)। মানুষের নিরাপদ পানির সংকট দূর করার উদ্যোগ জনকল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই পানি সংরক্ষণকে ব্যক্তিগত অভ্যাসের পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পানির আমানত রক্ষা : ভূগর্ভস্থ পানি অফুরন্ত নয়। নির্বিচারে উত্তোলন, দূষণ ও অপচয় অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ পানির সংকটে পড়তে হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৭)। আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা শুধু মুখে স্বীকার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণেও তার প্রকাশ ঘটে। তাই পানি উত্তোলনে পরিকল্পনা, অপচয় রোধ, জলাশয় সংরক্ষণ ও দূষণ প্রতিরোধের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পানির উৎস অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
ভূগর্ভস্থ পানি মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা এমন এক অমূল্য নেয়ামত, যার ওপর মানুষের জীবন, কৃষি ও পরিবেশের ভারসাম্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। অতএব ভূগর্ভস্থ পানি রক্ষা কেবল পরিবেশগত প্রয়োজন নয়; এটি আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা, মানবিক দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার সংরক্ষণের অংশ। পানি অপচয় বন্ধ করা, জলাশয় রক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র— সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন। মাটির নিচে সঞ্চিত এই অদৃশ্য নেয়ামতকে আজ রক্ষা করতে পারলেই আগামী দিনের জীবন, কৃষি ও মানবসভ্যতার জন্য পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
লেখক : এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে