প্রতীকী ছবিবিয়ে শুধু দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়, বরং ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি পরিবার গড়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ইসলামে বিয়েকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার বন্ধন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে সামাজিক রীতিনীতি, অতিরিক্ত প্রত্যাশা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজে না পাওয়ার কারণে অনেকের বিয়ে বিলম্বিত হয়। দীর্ঘ অপেক্ষায় কেউ কেউ হতাশ হয়ে পড়েন। এ সময় ধৈর্য ধরে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।
ইসলাম বিয়েকে সহজ করতে উৎসাহিত করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আর-রুম, আয়াত: ২১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) সামর্থ্যবান যুবকদের বিয়ের প্রতি উৎসাহিত করে বলেছেন, ‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬)
আরেক হাদিসে এসেছে, পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে বিয়ে করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহর দায়িত্ব। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৫৫)
বিয়ের জন্য অপেক্ষার সময় হতাশ না হয়ে দোয়া, ইবাদত ও বৈধ উপায়ে জীবনসঙ্গী খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত। কোরআন-হাদিসের আলোকে এমন তিনটি আমল তুলে ধরা হলো, যার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ প্রার্থনা করা যায়। তবে এগুলো পালনের ফলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিয়ে হবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
১. আন্তরিকভাবে দোয়া করা
জীবনের প্রয়োজন ও সংকটে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল। বিয়ের জন্যও নিজের ভাষায় আন্তরিকভাবে দোয়া করা যায়। আল্লাহর কাছে উত্তম চরিত্রের, দ্বীনদার ও কল্যাণকর জীবনসঙ্গী চাওয়ার পাশাপাশি নিজের চরিত্র সংশোধন, হালাল উপার্জন এবং বিয়ের পথে থাকা বাধা দূর করার জন্য প্রার্থনা করা যেতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যখন আমার বান্দারা তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তখন (বলে দাও) আমি তো নিকটেই। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৬)
দোয়ার পাশাপাশি পরিবারকে সম্পৃক্ত করে উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী খোঁজা এবং অযৌক্তিক সামাজিক বাধা কমানোর উদ্যোগ নেওয়াও প্রয়োজন।
২. কোরআনের দোয়া পড়া
উত্তম জীবনসঙ্গী ও নেককার পরিবার লাভের জন্য পবিত্র কোরআনের একটি দোয়া পড়া যেতে পারে। দোয়াটি সুরা আল-ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতে রয়েছে।
আরবি : رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণ : রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ‘ইউনিন, ওয়াজ‘আলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।
অর্থ :‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের চোখের প্রশান্তি দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।’ (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪)
এই দোয়ায় শুধু জীবনসঙ্গী লাভের আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এমন পরিবার গঠনের প্রার্থনাও রয়েছে, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও নেক আমলের পথে চলতে সহায়তা করবে। ফরজ নামাজের পর, নফল ইবাদতের সময় কিংবা অন্য যেকোনো সময়ে দোয়াটি পড়া যায়। তবে বিয়ের উদ্দেশ্যে এটি নির্দিষ্ট সংখ্যায় বা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পড়তে হবে—এমন সহিহ প্রমাণ নেই।
৩. নফল নামাজ পড়ে সাহায্য চাওয়া
কোনো কঠিন পরিস্থিতি বা দুশ্চিন্তার সময় নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া যায়। বিয়ে নিয়ে অনিশ্চয়তা বা প্রতিবন্ধকতা থাকলে নফল নামাজ আদায় করে নিজের প্রয়োজনের কথা আল্লাহর কাছে তুলে ধরা যেতে পারে।
হজরত হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে কোনো কঠিন বিষয় উপস্থিত হলে তিনি নামাজ আদায় করতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩১৯)
এ অনুসারে বিয়ের বিষয়ে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে নফল নামাজ আদায় করা যেতে পারে। নামাজ শেষে উত্তম জীবনসঙ্গী লাভ, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কল্যাণকর সময়ে বিয়ের ব্যবস্থা হওয়ার জন্য দোয়া করা যায়।
তবে ‘সালাতুল হাজত’ নামে প্রচলিত নামাজের নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও ফজিলতসংক্রান্ত হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তাই কোনো বিশেষ পদ্ধতিকে নিশ্চিতভাবে সুন্নত বা দ্রুত বিয়ে হওয়ার পরীক্ষিত আমল হিসেবে প্রচার না করে সাধারণ নফল নামাজ পড়ে দোয়া করাই সতর্ক পন্থা।
বিয়ে দেরিতে হওয়া নিজের অযোগ্যতা কিংবা আল্লাহর অসন্তুষ্টির নিশ্চিত প্রমাণ নয়। প্রত্যেকের পরিস্থিতি আলাদা। তাই দোয়া ও ইবাদতের পাশাপাশি পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে বাস্তবসম্মতভাবে জীবনসঙ্গী খোঁজা, অযৌক্তিক প্রত্যাশা কমানো এবং হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর কাছে এমন জীবনসঙ্গী প্রার্থনা করা উচিত, যিনি দুনিয়ার জীবনে প্রশান্তি এবং আখিরাতের কল্যাণ অর্জনে সহযোগী হবেন।
সময়ের আলো/জেডি