ছবি : সংগৃহীতইবাদত একজন মুমিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নামাজ, রোজা, দান-সদকা কিংবা মানুষের উপকার করা—সবই নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত। তবে শুধু আমল করলেই হবে না, সেই আমল আল্লাহর কাছে কবুল হওয়াও জরুরি। কারণ, ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং তাঁর কাছ থেকে প্রতিদান লাভ করা।
ইসলামে ইবাদত কবুলের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চারটি বিষয় হলো—বিশুদ্ধ ইমান, রাসুলের নির্দেশনা অনুসরণ, হালাল উপার্জন ও খাবার গ্রহণ এবং আমলে ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। চলুন, বিষয়গুলো জেনে নেওয়া যাক।
১. বিশুদ্ধ ইমান থাকা
নেক আমল কবুল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো বিশুদ্ধ ইমান। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখা, তাঁর নির্দেশ মেনে চলা এবং শিরক থেকে দূরে থাকা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করবে, পুরুষ হোক কিংবা নারী, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১২৪)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সৎকর্মের প্রতিদান লাভের সঙ্গে ইমানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই একজন মুমিনের উচিত বিশুদ্ধ ইমান নিয়ে জীবনযাপন করা এবং ইমানের পরিপন্থী কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
২. রাসুলের (সা.) নির্দেশনা অনুসরণ করা
ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। তবে কোনো কাজকে ইবাদত হিসেবে পালন করতে হলে তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা ও নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ধর্মের নামে এমন কোনো নতুন ইবাদত বা পদ্ধতি চালু করা উচিত নয়, যার ভিত্তি ইসলামে নেই।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এ বিষয়ে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (বুখারি, হাদিস : ২৬৯৭)
তাই ইবাদত করার ক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। নিজের ইচ্ছামতো কোনো পদ্ধতি তৈরি না করে রাসুলের (সা.) শেখানো নিয়মে ইবাদত করার চেষ্টা করতে হবে।
৩. হালাল উপার্জন ও পবিত্র খাবার গ্রহণ করা
ইবাদত কবুলের ক্ষেত্রে হালাল উপার্জন ও পবিত্র খাবার গ্রহণের গুরুত্ব অনেক। একজন মানুষ নিয়মিত নামাজ পড়তে পারেন, রোজা রাখতে পারেন কিংবা দান-সদকা করতে পারেন। কিন্তু তাঁর উপার্জন ও জীবনযাপনে হারামের প্রভাব থাকলে তা তাঁর দোয়া ও ইবাদত কবুলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০১৫)
এই হাদিসে এমন এক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যিনি দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত ও ধুলামলিন অবস্থায় দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। কিন্তু তাঁর খাবার, পানীয় ও পোশাক হারাম এবং তাঁর উপার্জনও হারাম। এ অবস্থায় তাঁর দোয়া কীভাবে কবুল হবে—সে বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রশ্ন তুলেছেন।
এ থেকে বোঝা যায়, শুধু ইবাদত করাই যথেষ্ট নয়; উপার্জন ও ভোগের ক্ষেত্রেও হালাল-হারামের বিধান মেনে চলা জরুরি। তাই সৎ উপায়ে উপার্জন করা, হালাল খাবার গ্রহণ করা এবং হারাম থেকে দূরে থাকা একজন মুমিনের দায়িত্ব।
৪. আমলে ইখলাস থাকা
ইবাদত কবুলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ইখলাস। এর অর্থ, মানুষের প্রশংসা বা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের জন্য নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদত ও নেক আমল করা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের তো এ ছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে তারা আল্লাহর ইবাদত করবে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে।’ (সুরা বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৫)
কেউ যদি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য দান করেন, নিজেকে ধার্মিক হিসেবে তুলে ধরতে ইবাদত করেন কিংবা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের উদ্দেশ্যে ভালো কাজ করেন, তবে তা ইখলাসের পরিপন্থী। ইসলামে লোকদেখানো মনোভাবকে ‘রিয়া’ বলা হয়, যা নিন্দিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সেই নামাজিদের জন্য, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন; যারা লোকদেখানোর জন্য তা করে।’ (সুরা মাউন, আয়াত : ৪-৬)
তাই কোনো আমল করার আগে নিজের নিয়ত যাচাই করা প্রয়োজন। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—আমি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজটি করছি, নাকি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য? নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা এবং লোকদেখানো মনোভাব থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করাই ইখলাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একজন মুমিনের জীবনে ইবাদতের পাশাপাশি নিয়ত, উপার্জন ও জীবনযাপনের বিশুদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশুদ্ধ ইমান রাখা, রাসুলের (সা.) নির্দেশনা অনুসরণ করা, হালাল উপার্জন করা এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমল করার মাধ্যমে ইবাদত কবুলের জন্য চেষ্টা করা উচিত।
সময়ের আলো/এসএকে