শ্বাস-প্রশ্বাস : প্রতি মুহূর্তের অদৃশ্য নেয়ামত

মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি

ইসলাম

মানুষের জীবনে এমন কিছু নেয়ামত রয়েছে, যেগুলো ছাড়া এক মুহূর্তও বেঁচে থাকা সম্ভব নয়; অথচ সেগুলোর গুরুত্ব আমরা খুব কমই

2026-10-22T09:46:46+00:00
2026-10-22T09:51:15+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
৬ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
ইসলাম
শ্বাস-প্রশ্বাস : প্রতি মুহূর্তের অদৃশ্য নেয়ামত
মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৪৬ এএম  আপডেট: ২২.১০.২০২৬ ৯:৫১ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষের জীবনে এমন কিছু নেয়ামত রয়েছে, যেগুলো ছাড়া এক মুহূর্তও বেঁচে থাকা সম্ভব নয়; অথচ সেগুলোর গুরুত্ব আমরা খুব কমই উপলব্ধি করি। শ্বাস-প্রশ্বাস তেমনই এক অমূল্য নেয়ামত। ঘুমে কিংবা জাগরণে, কর্মব্যস্ততায় কিংবা বিশ্রামে— প্রতি মুহূর্তে নিঃশব্দে আমাদের জীবন সচল রাখছে এই প্রক্রিয়া। অথচ আমরা খুব কমই ভাবি, প্রতিটি শ্বাসের পেছনে মহান আল্লাহর কত অসীম দয়া ও কুদরত কাজ করছে।

আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন : মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আল্লাহর সুনিপুণ সৃষ্টির পরিচয় বহন করে। নাক দিয়ে বাতাস গ্রহণ, ফুসফুসে অক্সিজেন প্রবেশ, রক্তের মাধ্যমে তা দেহের বিভিন্ন কোষে পৌঁছানো এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দেওয়া— সবকিছুই এক বিস্ময়কর ব্যবস্থার অংশ। মানুষের ইচ্ছা ছাড়াই এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে); তবু কি তোমরা দেখতে পাও না?’ (সুরা যারিয়াত, আয়াত : ২১)। মানবদেহের শ্বাস-প্রশ্বাসব্যবস্থাও আল্লাহর কুদরত অনুধাবনের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

প্রতিটি শ্বাস জীবনের নতুন সুযোগ : একটি শ্বাস গ্রহণ মানে জীবনের আরও একটি মুহূর্ত লাভ করা। মানুষ ভবিষ্যতের অনেক পরিকল্পনা করে, অথচ পরবর্তী শ্বাসটি গ্রহণ করতে পারবে কি না, তা তার জানা নেই। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে কল্যাণকর কাজে ব্যয় করা উচিত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর সেদিন অবশ্যই তোমাদের নেয়ামতগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (সুরা তাকাসুর, আয়াত : ৮)। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের মতো শ্বাস-প্রশ্বাসের নেয়ামত সম্পর্কেও মানুষের দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

শ্বাস-প্রশ্বাসের নেয়ামত ও আল্লাহর রহমত : মানুষ ঘুমিয়ে পড়লেও তার শ্বাস-প্রশ্বাস সাধারণত চলতে থাকে। এ সময় সে নিজের জীবন রক্ষায় সচেতনভাবে কোনো কাজ করে না। অথচ মহান আল্লাহর নির্ধারিত শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থা তাকে বাঁচিয়ে রাখে। আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১৮)। প্রতিটি স্বাভাবিক শ্বাস এই অসংখ্য নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান : আমরা যে বাতাস গ্রহণ করি, তার অক্সিজেন দেহের কোষে শক্তি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাসের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগের প্রক্রিয়া জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। বাতাসের এই উপাদানটি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর অভাবে মানুষের জীবন মারাত্মক সংকটে পড়ে। মহান আল্লাহ পৃথিবীতে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সৃষ্টি করেছেন। তাই প্রকৃতির এই ব্যবস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।

শ্বাসকষ্ট আমাদের সুস্থতার মূল্য বোঝায় : যতক্ষণ শ্বাস স্বাভাবিক থাকে, ততক্ষণ অনেকেই এর গুরুত্ব অনুভব করেন না। কিন্তু শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে বোঝা যায়, স্বাভাবিকভাবে নিশ্বাস নেওয়াও কত বড় নেয়ামত। অসুস্থ মানুষের কাছে একটি স্বস্তিদায়ক শ্বাস অনেক সময় অমূল্য সম্পদের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই সুস্থ অবস্থায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।

শ্বাসের নেয়ামত ও পরিবেশ সংরক্ষণ : পরিষ্কার বাতাস মানুষের সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য। অথচ ধোঁয়া, ধুলাবালি, যানবাহনের দূষণ, কল-কারখানার নির্গমন এবং নির্বিচারে বৃক্ষনিধন বায়ুর মান নষ্ট করে। এর প্রভাব পড়ে মানুষের শ্বাসতন্ত্র ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। ইসলাম মানুষকে পৃথিবীতে দায়িত্বশীল জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। তাই গাছ লাগানো, পরিবেশদূষণ কমানো এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়; বরং মানুষের জীবন ও সৃষ্টিজগতের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

শ্বাসের সঙ্গে জিকির ও কৃতজ্ঞতার সম্পর্ক : মুমিনের জীবন আল্লাহর স্মরণে সমৃদ্ধ হয়। প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে আল্লাহর দেওয়া জীবনের কথা স্মরণ করা যায়। নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া এবং মানুষের কল্যাণে কাজের মাধ্যমে জীবনকে অর্থবহ করা সম্ভব। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব; আর আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫২)। শ্বাস-প্রশ্বাসের নেয়ামতের যথার্থ কৃতজ্ঞতা হলো আল্লাহর আনুগত্যে জীবন পরিচালনা করা।

প্রতিটি শ্বাসের সদ্ব্যবহার : মানুষের জীবন সীমিত; তাই প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। যে শ্বাসের মাধ্যমে মানুষ বেঁচে আছে, সেই শ্বাসের সময়টুকু অন্যায়, বিদ্বেষ ও অর্থহীন কাজে নষ্ট না করে জ্ঞান অর্জন, ইবাদত, সৎকর্ম এবং মানবসেবায় ব্যয় করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত— সুস্থতা ও অবসর’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)। সুস্থ শরীর ও জীবনের অবসরকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

শ্বাস-প্রশ্বাসের বৈজ্ঞানিক বিস্ময় : মানবদেহে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুস, শ্বাসনালি, ডায়াফ্রাম, রক্তসঞ্চালন এবং স্নায়ুতন্ত্র সমন্বিতভাবে কাজ করে। সাধারণত একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিশ্রামরত অবস্থায় প্রতি মিনিটে প্রায় ১২২০ বার শ্বাস নেন; ব্যক্তিভেদে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী এর পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ এক দিনে হাজারো বার শ্বাস নেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা প্রতিটি শ্বাসের কথা আলাদাভাবে চিন্তা করি না। এই স্বয়ংক্রিয় ও সমন্বিত ব্যবস্থা মানবদেহের জটিলতা এবং সৃষ্টির বিস্ময়কে তুলে ধরে।

নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা হোক জীবনের অঙ্গীকার : শ্বাস-প্রশ্বাস এমন এক নেয়ামত, যার মূল্য উপলব্ধি করতে অনেক সময় মানুষকে অসুস্থতা কিংবা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু প্রকৃত মুমিন সংকটের অপেক্ষা করেন না; বরং সুস্থতা ও স্বাভাবিক জীবনেও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকেন। তিনি নিজের শরীরের যত্ন নেন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখেন, অসুস্থ মানুষের সেবা করেন এবং প্রতিটি মুহূর্তকে কল্যাণের কাজে ব্যয় করার চেষ্টা করেন। শ্বাস-প্রশ্বাস কেবল একটি জৈবিক প্রক্রিয়া নয়; এটি মহান আল্লাহর দেওয়া জীবনের এক অবিরাম উপহার। 

প্রতিটি নিশ্বাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবন আমাদের নিজস্ব ক্ষমতায় পরিচালিত নয়; বরং আমরা প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর রহমত ও সৃষ্টিগত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রতিটি শ্বাসের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করা, জীবনকে সৎকর্মে সাজানো এবং পৃথিবীকে নির্মল রাখার চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য। আসুন, প্রতিটি শ্বাসকে আল্লাহর স্মরণ, মানবকল্যাণ ও নেক আমলের মাধ্যমে অর্থবহ করে তুলি।

লেখক : এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   শ্বাস-প্রশ্বাস : প্রতি মুহূর্তের অদৃশ্য নেয়ামত 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: