গ্রাফিক সময়ের আলোপবিত্র কুরআনের শেষ সুরা সুরা আন-নাস। ছয় আয়াতবিশিষ্ট এ সুরায় মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা সৃষ্টিকারীর অনিষ্ট থেকে মহান আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে শেখানো হয়েছে। মানুষের জীবনে বাহ্যিক বিপদের পাশাপাশি অন্তরের দুর্বলতা, পাপের প্ররোচনা ও সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সুরা নাস মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সব ধরনের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা কামনার জন্য মহান আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘বলুন, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের রবের, মানুষের অধিপতির, মানুষের ইলাহের কাছে, আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, জ্বিন ও মানুষের মধ্য থেকে’ (সুরা নাস, আয়াত : ১-৬)। এ আয়াতগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার তিনটি মহান পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। তিনি মানুষের রব বা প্রতিপালক, মানুষের মালিক বা অধিপতি এবং মানুষের ইলাহ বা একমাত্র উপাস্য। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, প্রতিপালন করেন এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের ওপর তাঁরই সর্বময় কর্তৃত্ব। তাই ইবাদত, আনুগত্য ও আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রে একমাত্র তাঁর দিকেই ফিরে যেতে হবে।
সুরার শুরুতে ‘বলুন’ শব্দের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উম্মতের জন্যও শিক্ষা রয়েছে। মানুষ নিজের জ্ঞান, বুদ্ধি ও সামর্থ্য অনুযায়ী বিপদ থেকে বাঁচার চেষ্টা করবে, কিন্তু প্রকৃত নিরাপত্তার জন্য মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে। কারণ মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতা সীমিত, আর আল্লাহ তায়ালার জ্ঞান ও ক্ষমতা অসীম। সুরাটিতে ‘আল-ওয়াসওয়াসিল খান্নাস’ শব্দবন্ধের মাধ্যমে এমন কুমন্ত্রণাদাতাকে বোঝানো হয়েছে, যে মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয় এবং আল্লাহকে স্মরণ করলে পিছিয়ে যায় বা আত্মগোপন করে। তাফসিরবিদদের ব্যাখ্যায় এখানে শয়তানের কুমন্ত্রণার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখিত হয়েছে। শয়তান মানুষের মনে সন্দেহ, পাপের আকর্ষণ ও অন্যায়ের প্ররোচনা সৃষ্টি করে তাকে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। কখনো অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ ও লোভের মাধ্যমে মানুষকে অন্যায়ের দিকে ঠেলে দেয়, আবার কখনো মিথ্যা ও প্রতারণাকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করায়। এভাবে মানুষের চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। তবে মনে অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো মন্দ চিন্তা আসা আর সচেতনভাবে তা গ্রহণ করে অন্যায় করা এক বিষয় নয়। অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা এলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে এবং সঠিক কাজের প্রতি অবিচল থাকতে হবে। আল্লাহর স্মরণ, কুরআন তেলাওয়াত, ইবাদত ও আত্মসমালোচনা মানুষকে নিজের ভুল উপলব্ধি করতে এবং নৈতিকভাবে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করে।
সুরার শেষ আয়াতে কুমন্ত্রণাদাতার উৎস হিসেবে জ্বিন ও মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, মানুষকে অন্যায়ের পথে পরিচালিত করার চেষ্টা শুধু অদৃশ্য শয়তানের মাধ্যমেই হয় না; মানুষের মধ্যেও এমন ব্যক্তি থাকতে পারে, যারা মন্দ পরামর্শ, প্রতারণা, মিথ্যা প্রচার কিংবা অন্যায় কাজে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে অন্যকে বিপথে পরিচালিত করে। তাই সঙ্গী নির্বাচন, পরামর্শ গ্রহণ ও কোনো বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সচেতন থাকা জরুরি। যে পরামর্শ মানুষকে অন্যের অধিকার নষ্ট করতে, মিথ্যা বলতে কিংবা আল্লাহর অবাধ্য হতে উৎসাহিত করে, তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। একই সঙ্গে নিজের কথা ও কাজের মাধ্যমে অন্যকে অন্যায়ের দিকে পরিচালিত করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। সুরা নাসের সঙ্গে সুরা ফালাকের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। এ দুটি সুরাকে একত্রে ‘মুআউবিযাতাইন’ বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে শয়নকালে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করে দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিতেন এবং শরীরের যতটুকু সম্ভব মুছে নিতেন। তিনি এভাবে তিনবার করতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০১৭)। এ হাদিস থেকে ঘুমানোর আগে এসব সুরা পাঠের গুরুত্ব জানা যায়। সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন আমলেও সুরা নাস পাঠের শিক্ষা রয়েছে। নিয়মিত তেলাওয়াতের পাশাপাশি এর অর্থ বোঝা এবং জীবনে এর শিক্ষা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা প্রয়োজন।
সুরা নাসের শিক্ষা শুধু তেলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মর্ম উপলব্ধি করে জীবন পরিচালনা করাও জরুরি। নিজের অন্তরের অবস্থা পর্যালোচনা করা, ভুল হলে তওবা করা, সৎ মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা এবং কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা ঈমানি জীবন গঠনে সহায়ক। পরিবারের শিশুদেরও সুরাটির শুদ্ধ উচ্চারণ ও অর্থ শেখানো উচিত, যাতে তারা ছোটবেলা থেকেই আল্লাহর ওপর ভরসা, সত্যবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতার শিক্ষা লাভ করতে পারে। পাশাপাশি ভিত্তিহীন ভয় ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকতে হবে। প্রতিটি সমস্যাকে অদৃশ্য কোনো প্রভাবের ফল মনে না করে বাস্তবতা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাও দায়িত্বশীলতার অংশ। সুরা নাসের ছয়টি আয়াত আমাদের শেখায়, মানুষের রব, অধিপতি ও একমাত্র উপাস্য মহান আল্লাহর কাছেই কুমন্ত্রণা ও অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইতে হবে। তাঁর স্মরণে অন্তরকে জাগ্রত রাখতে হবে, অসৎ প্ররোচনা প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং সৎকর্মের মাধ্যমে জীবনকে সুন্দর করতে হবে। আসুন, আমরা নিয়মিত সুরা নাস তেলাওয়াত করি, এর অর্থ ও তাৎপর্য উপলব্ধি করি এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর শিক্ষা অনুসরণের চেষ্টা করি। মহান আল্লাহ আমাদের শয়তানের কুমন্ত্রণা ও যাবতীয় অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন, অন্তরকে পবিত্র রাখুন এবং ঈমান ও নেক আমলের ওপর অবিচল থাকার তওফিক দান করুন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা